মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চরের বুকে সেই চার তারকা মানের রিসোর্ট: স্মৃতির পাতায় সম্ভাবনার গল্প

তাসলিমুল হাসান সিয়াম:ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা চর বাংলার প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়। বর্ষায় যার রূপ ভয়াল, শুষ্ক মৌসুমে তা হয়ে ওঠে রুক্ষ -শান্ত, বিস্তীর্ণ বালুচর। কিন্তু এই চরই একদিন সাক্ষী হয়েছিল এক অভূতপূর্ব আয়োজনের। যেখানে গ্রামীণ সৌন্দর্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছিল চার তারকা মানের ‘ গ্রামীণ রিসোর্ট ’।

 

 

অবিশ্বাস্য এই আয়োজনের ইতিহাসটি নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা। তাই স্মৃতির পাতায় চোখ বুলিয়ে দেখতেই ধরা পড়লো ব্রহ্মপুত্রের চরের সেই রিসোর্টের কথা।

 

২০১০ সালের সেই আয়োজন নিছক কোনো আয়োজন ছিল না; ছিল এক সম্ভাবনাময় কল্পনার বাস্তব রূপ। থাইল্যান্ডের রাজকন্যা মাহা চাকরি’র আগমন উপলক্ষে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের রসুলপুরে বালুচরের উপর পলিমাটি ফেলে, সবুজ ঘাস বিছিয়ে, ফুলের বাগানে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল এক স্বপ্নগ্রাম। বাইরে থেকে কুঁড়েঘরের সরলতা, আর ভেতরে চার তারকা মানের আধুনিক সুবিধা—এই বৈপরীত্যই ছিল আয়োজনটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

 

৩৫টি কুঁড়েঘরের প্রতিটিতে ছিল বাঁশের তৈরি নান্দনিক আসবাব, আধুনিক টয়লেট-বেসিন, এমনকি ঝরনাসহ গোসলখানা। গ্রামীণ ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করার এই প্রয়াস যেন দেখিয়ে দিয়েছিল—উন্নয়ন মানেই কংক্রিটের জঙ্গল নয়; উন্নয়ন হতে পারে শিকড়ের সঙ্গেও।

 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চার তারকা মানের সুবিধা সম্বলিত সেই হোটেলটি তৈরিতে রসুলপুর চরের ৩০ বিঘা জমি ১ বছরের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়। বিঘা প্রতি জমির মালিক ২ হাজার টাকা ভাড়া পান ।

 

রিসোর্টের চারপাশে ছিলো একই আকারের ৩৫ টি কুঁড়ে ঘর মাঝখানে ছিল গোল বৈঠকখানা যেখানে বসে যেন শোনা যায় বাংলার গল্প। পাশে রান্নাঘর, পিঠাঘর, হস্তশিল্পের ঘর—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক আবহ। খেজুর পাতার নকশি পাটি, হারিকেনের আলো, আর শিকায় ঝুলে থাকা কারুশিল্প যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল আমাদের হারাতে বসা ঐতিহ্যকে।

এই পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছিল সুপরিকল্পিত উদ্যোগে। ঢাকার ‘সিন অফ সিন’ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে এবং চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছিল এই রিসোর্ট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কুটিরশিল্পীরা তাদের দক্ষতায় চরের বুকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন নান্দনিকতার এক অনন্য উদাহরণ। বিদ্যুতের জন্য বসানো হয়েছিল শক্তিশালী ২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশাল জেনারেটর, পাশাপাশি ছিল সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল বেশ অগ্রসর চিন্তা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আয়োজন হারিয়ে গেছে। নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে সেই রিসোর্ট। আজ সেখানে চাষ হচ্ছে ভুট্টা , নেই সেই রাজকীয় প্রস্তুতি। তবুও চর আছে, নদী আছে, আছে প্রকৃতির অপরূপ রূপ।

 

চর বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্রের চরগুলো হতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ইকো-ট্যুরিজম স্পট। এখানে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, কুটিরশিল্প ও লোকসংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে, এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনে যোগ হবে নতুন মাত্রা।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। চরের ভৌগোলিক অস্থিরতা, নদীভাঙন, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিনিয়োগের অভাব সব মিলিয়ে এটি একটি কঠিন ক্ষেত্র। টেকসই পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় ছাড়া এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব নয়।

থাই রাজকন্যার সেই সফর ছিল ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার প্রভাব ছিল গভীর। এটি প্রমাণ করে গেছে সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ থাকলে ব্রহ্মপুত্রের চরও হতে পারে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র।

আজ প্রয়োজন নতুন করে ভাবার। প্রয়োজন সেই পুরোনো স্বপ্নকে আধুনিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার। কারণ, যে চরে একদিন রাজকীয় আয়োজন সম্ভব হয়েছিল, সেই চরই হয়তো আগামী দিনের বাংলাদেশের পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

 

 

 

চরের বুকে সেই চার তারকা মানের রিসোর্ট: স্মৃতির পাতায় সম্ভাবনার গল্প

প্রকাশের সময়: ০৪:১০:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

তাসলিমুল হাসান সিয়াম:ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা চর বাংলার প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়। বর্ষায় যার রূপ ভয়াল, শুষ্ক মৌসুমে তা হয়ে ওঠে রুক্ষ -শান্ত, বিস্তীর্ণ বালুচর। কিন্তু এই চরই একদিন সাক্ষী হয়েছিল এক অভূতপূর্ব আয়োজনের। যেখানে গ্রামীণ সৌন্দর্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছিল চার তারকা মানের ‘ গ্রামীণ রিসোর্ট ’।

 

 

অবিশ্বাস্য এই আয়োজনের ইতিহাসটি নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা। তাই স্মৃতির পাতায় চোখ বুলিয়ে দেখতেই ধরা পড়লো ব্রহ্মপুত্রের চরের সেই রিসোর্টের কথা।

 

২০১০ সালের সেই আয়োজন নিছক কোনো আয়োজন ছিল না; ছিল এক সম্ভাবনাময় কল্পনার বাস্তব রূপ। থাইল্যান্ডের রাজকন্যা মাহা চাকরি’র আগমন উপলক্ষে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের রসুলপুরে বালুচরের উপর পলিমাটি ফেলে, সবুজ ঘাস বিছিয়ে, ফুলের বাগানে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল এক স্বপ্নগ্রাম। বাইরে থেকে কুঁড়েঘরের সরলতা, আর ভেতরে চার তারকা মানের আধুনিক সুবিধা—এই বৈপরীত্যই ছিল আয়োজনটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

 

৩৫টি কুঁড়েঘরের প্রতিটিতে ছিল বাঁশের তৈরি নান্দনিক আসবাব, আধুনিক টয়লেট-বেসিন, এমনকি ঝরনাসহ গোসলখানা। গ্রামীণ ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করার এই প্রয়াস যেন দেখিয়ে দিয়েছিল—উন্নয়ন মানেই কংক্রিটের জঙ্গল নয়; উন্নয়ন হতে পারে শিকড়ের সঙ্গেও।

 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চার তারকা মানের সুবিধা সম্বলিত সেই হোটেলটি তৈরিতে রসুলপুর চরের ৩০ বিঘা জমি ১ বছরের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়। বিঘা প্রতি জমির মালিক ২ হাজার টাকা ভাড়া পান ।

 

রিসোর্টের চারপাশে ছিলো একই আকারের ৩৫ টি কুঁড়ে ঘর মাঝখানে ছিল গোল বৈঠকখানা যেখানে বসে যেন শোনা যায় বাংলার গল্প। পাশে রান্নাঘর, পিঠাঘর, হস্তশিল্পের ঘর—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক আবহ। খেজুর পাতার নকশি পাটি, হারিকেনের আলো, আর শিকায় ঝুলে থাকা কারুশিল্প যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল আমাদের হারাতে বসা ঐতিহ্যকে।

এই পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছিল সুপরিকল্পিত উদ্যোগে। ঢাকার ‘সিন অফ সিন’ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে এবং চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছিল এই রিসোর্ট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কুটিরশিল্পীরা তাদের দক্ষতায় চরের বুকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন নান্দনিকতার এক অনন্য উদাহরণ। বিদ্যুতের জন্য বসানো হয়েছিল শক্তিশালী ২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশাল জেনারেটর, পাশাপাশি ছিল সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল বেশ অগ্রসর চিন্তা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আয়োজন হারিয়ে গেছে। নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে সেই রিসোর্ট। আজ সেখানে চাষ হচ্ছে ভুট্টা , নেই সেই রাজকীয় প্রস্তুতি। তবুও চর আছে, নদী আছে, আছে প্রকৃতির অপরূপ রূপ।

 

চর বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্রের চরগুলো হতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ইকো-ট্যুরিজম স্পট। এখানে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, কুটিরশিল্প ও লোকসংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে, এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনে যোগ হবে নতুন মাত্রা।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। চরের ভৌগোলিক অস্থিরতা, নদীভাঙন, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিনিয়োগের অভাব সব মিলিয়ে এটি একটি কঠিন ক্ষেত্র। টেকসই পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় ছাড়া এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব নয়।

থাই রাজকন্যার সেই সফর ছিল ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার প্রভাব ছিল গভীর। এটি প্রমাণ করে গেছে সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ থাকলে ব্রহ্মপুত্রের চরও হতে পারে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র।

আজ প্রয়োজন নতুন করে ভাবার। প্রয়োজন সেই পুরোনো স্বপ্নকে আধুনিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার। কারণ, যে চরে একদিন রাজকীয় আয়োজন সম্ভব হয়েছিল, সেই চরই হয়তো আগামী দিনের বাংলাদেশের পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।