
তাসলিমুল হাসান সিয়াম: রাত নামলেই এখন অনেক পরিবারের উদ্বেগ শুরু হয়। কেউ বাসায় ফিরতে দেরি করলে মায়ের ফোনের পর ফোন, সন্তান বাইরে গেলে বাবার অস্থিরতা, কিংবা রাস্তায় বের হওয়ার আগে পকেটের চেয়ে বেশি মানুষ এখন চারপাশ দেখে নেয়। রাজধানী থেকে জেলা শহর—সবখানেই যেন এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি কিংবা প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন সংবাদ নয়; বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে উঠছে।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য উদ্বেগ বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট। জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যাকাণ্ড—সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি কান্না, একটি থেমে যাওয়া জীবন। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এসব অপরাধের অনেক ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ অপরাধ দেখছে, ভয় পাচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে সেই ভয় ধীরে ধীরে অসাড়তাতেও রূপ নিচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, যখন কোনো সমাজে অপরাধের দৃশ্য মানুষ নিয়মিত দেখতে শুরু করে, তখন দুটি বিপজ্জনক পরিবর্তন ঘটে। প্রথমত, সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। দ্বিতীয়ত, অপরাধ ধীরে ধীরে “স্বাভাবিক” হয়ে যেতে শুরু করে। আজ শিশু-কিশোররাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে মারধর, কুপিয়ে হত্যা কিংবা অস্ত্রের মহড়া দেখতে পাচ্ছে। এটি তাদের মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলছে। ভয়, রাগ, প্রতিশোধপ্রবণতা কিংবা সহিংসতার প্রতি অসংবেদনশীলতা—সবই বাড়ছে নীরবে।
বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সংকট কেবল অপরাধ বৃদ্ধি নয়; বরং মানুষের আস্থার সংকট। মানুষ জানতে চায়—সে কি নিরাপদ? আইন কি সবার জন্য সমানভাবে কাজ করছে? অপরাধীরা কি সত্যিই শাস্তি পাচ্ছে? যখন এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মানুষ খুঁজে পায় না, তখন সমাজে ক্ষোভ জমতে থাকে। সেই ক্ষোভ একসময় জনরোষে রূপ নিতে পারে, যা কোনো রাষ্ট্রের জন্যই শুভ নয়।
অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে নানা কারণ রয়েছে। বেকারত্ব, মাদক, রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক বৈষম্য, বিচারহীনতার সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে অপরাধের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক তরুণ দ্রুত অর্থ বা প্রভাবের মোহে অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তির অপব্যবহারও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন যেমন তথ্য ছড়ানোর মাধ্যম, তেমনি ভয় ও গুজব ছড়ানোরও বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
তবে শুধুই হতাশার গল্প বলে থেমে গেলে চলবে না। সমাজকে বাঁচাতে হলে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ মানুষ—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অপরাধ দমনে দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে যেন কোনো অপরাধী ছাড় না পায়, সেই বার্তা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইসঙ্গে তরুণদের কর্মসংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষায় গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
মিডিয়ারও দায়িত্ব রয়েছে। অপরাধের সংবাদ অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে, তবে সেটিকে যেন আতঙ্কের প্রদর্শনী বানানো না হয়। কারণ অতিরিক্ত সহিংস দৃশ্য মানুষের মনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবার থেকেও সন্তানদের প্রতি নজরদারি ও মানবিক শিক্ষা বাড়ানো জরুরি।
আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষ অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতার সংকটেও ভুগছে। কিন্তু একটি সমাজ কখনো শুধু আইন দিয়ে নিরাপদ হয় না; নিরাপদ হয় ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে। আজ প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনের পাশাপাশি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে সাধারণ মানুষ অন্তত এটুকু বিশ্বাস করতে পারে—“আমি এই সমাজে নিরাপদ।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 













