
বিশ্বরাজনীতিতে শক্তির ভাষা কখনও কোমল নয়। যে রাষ্ট্র যত শক্তিশালী, তার প্রভাবের পরিধি তত বিস্তৃত। গত আড়াই দশক আমাদের শিখিয়েছে যে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা অন্যত্র বিশ্বশক্তির সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো মানে শুধু বক্তব্য দেওয়া নয়; তার পরিণতি বহন করার প্রস্তুতিও থাকা দরকার। কেউ কেউ স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে পছন্দ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো তাদের স্রোতের শক্তি বোঝার ক্ষমতা কি ছিল? বাংলাদেশের রাজনীতিতেও আমরা এমন উচ্চারণ শুনেছি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুবার প্রকাশ্যে আমেরিকার নীতির সমালোচনা করেছেন ।গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়েও । তিনি দৃঢ় ভাষায় বলতেন, বাংলাদেশ কারও চোখ রাঙানিতে মাথা নত করবে না।কথাগুলো রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী শোনায় আবার জাতীয় আত্মমর্যাদার ভাষা হিসেবে তা জনপ্রিয়ও হয়।কিন্তু আন্তর্জাতিক বাস্তবতা আবেগ দিয়ে চলে না; চলে ভারসাম্য, কৌশল ও হিসাবের সমীকরণে। বিশ্বশক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্ব মানে কেবল বক্তব্য নয় বরং অর্থনীতি, কূটনীতি, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার উপরেও তার প্রভাব পড়ে।ইরানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, নিষেধাজ্ঞা কেবল সরকারের বিরুদ্ধে নয়; তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেও বহুমাত্রিক চাপে ফেলে। আফগানিস্তান প্রমাণ করেছে, সামরিক সাফল্য রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করে না।ইরাক দেখিয়েছে, শাসক অপসারণ মানেই শান্তি নয়।তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় যে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো কি কেবল সাহসের পরিচয়? নাকি কৌশলগত পরিণতির হিসাব না রাখার ফসল ।শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হলে অবশ্যই প্রয়োজন শক্ত ভিত, অর্থনৈতিক স্থিতি, কূটনৈতিক মিত্রতা, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য।এই চারটির কোনো একটি দুর্বল হলে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো মানে হয়ে যায় অথৈ জলে নামা। আর যে সাঁতার জানে না, তাকে তো অবধারিতভাবে স্রোতের দিকে ভাসতেই হবে । বিশ্বরাজনীতি নৈতিকতার ভাষায় শুরু হলেও শেষ হয় শক্তির লড়াই হিসাবেই ।তাই রাষ্ট্রনায়কদের দায়িত্ব শুধু বক্তব্য দেওয়া নয়; পরিণতির পথও প্রস্তুত রাখা ।শেখ হাসিনার সমালোচনা যেমন একধরনের অবস্থান ছিল, তেমনি সেই অবস্থানের দায়ও ইতিহাস বিচার করবে যা কৌশলগত ছিল, নাকি আবেগনির্ভর। দৈনিক কালের চিঠি মনে করে এই বলে যে শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলা অপরাধ নয় কিন্তু শক্তিকে অবমূল্যায়ন করা আত্মঘাতী।রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষার জন্য সাহস প্রয়োজন কিন্তু সেখানে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন প্রজ্ঞা।স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে হলে পায়ের নিচের মাটি শক্ত হতে হবে ।নচেৎ ইতিহাস এমন নির্মমতা দেখাবে যা কাউকে আবেগের জন্য পুরস্কৃত করে না।
নিজস্ব প্রতিবেদক 













