
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন। এটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই বাজেটের লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের ওপর থেকে করের বোঝা কমানো এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিনিয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং অর্থ প্রবাহ বাড়াতে এই শুল্ক ও ভ্যাট ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন এই বাজেটে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে অনেক পণ্য ও সেবার ওপর থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকে শুরু করে প্রযুক্তি ও চিকিৎসা খাতের অনেক পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমতে পারে।’
নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি
প্রস্তাবিত বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর থেকে উৎসে কর কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা এবং লবণের দাম কমবে। একই সঙ্গে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। শিশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে করছাড় দেওয়ায় বাজারে শিশুখাদ্যের দামও কমবে। এছাড়া আমদানি করা সব ধরনের মসলা ও খেজুরের ওপর থেকে ৫ শতাংশ শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার ফলে বাজারে এসব পণ্যের দাম বেশ কমে আসবে।
চিকিৎসা খাতের ব্যয় হ্রাসে বিশেষ গুরুত্ব
সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচ কমাতে নতুন বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা কাজে বহুল ব্যবহৃত হার্টের রিং এবং চোখের লেন্সের ওপর থাকা ১০ শতাংশ ভ্যাট পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিটি হার্টের রিংয়ের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং চোখের লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমে আসবে। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের খরচ কমাতে ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ৫ শতাংশ অগ্রিম কর এবং ব্লাড টিউবিং সেটের সাড়ে ৭ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণ মওকুফের প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে রোগীদের প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। বিশ্বমানের ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনে উৎসাহ দিতে নতুন ৯টি উপকরণ আমদানি তালিকায় যুক্ত করে সেগুলোর শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য করা হয়েছে। তাছাড়া বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্য আমদানির অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যে বড় ছাড়
ডিজিটাল বাংলাদেশ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে তথ্যপ্রুক্তি খাতে ব্যাপক করছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। সব ধরনের ইভি (ইলেকট্রিক) গাড়ি, সোলার, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব শুল্ক, ট্যাক্স ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। দেশের বাজারে এসএসডি ও পজ মেশিন আমদানির ক্ষেত্রেও কর এবং শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হচ্ছে। স্মার্টকার্ড, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড উৎপাদনের খরচ কমবে এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া কর ছাড়ের ফলে দেশি মোবাইল, রেফ্রিজারেটর, এটিএম মেশিন, এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমতে পারে।
দেশীয় শিল্প ও ব্যবসা খাতের বিকাশ
স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসাকে চাঙ্গা করতে বাজেটে বড় ধরনের ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে জুয়েলারি সেবার বিপরীতে প্রতি ভরিতে ২,৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে। অন্যদিকে মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে সিমের মূল দামের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য হবে। স্থানীয় স্কিন কেয়ার ও বিউটি প্রোডাক্টসের কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং স্থানীয় কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, কৃষি ও পরিবহন খাতে বিশেষ সুবিধা
পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক আমদানি এবং চার্জিং স্টেশনের ৫ শতাংশ উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার ফলে পরিবেশবান্ধব এসব গাড়ির দাম কমবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার উৎসে কর ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সৌর বিদ্যুৎ খাতের উপকরণসমূহ আমদানিতে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত সব ধরনের শুল্ক ও ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাবও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কৃষিখাতে স্বস্তি দিতে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের জন্য ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে মূসক শূন্য করা হয়েছে, যা সারের দাম কমাতে সাহায্য করবে। ভেটেরিনারি ওষুধ, পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের খাদ্য উৎপাদন ব্যয়ও কমবে। ডিটারজেন্ট শিল্পের কাঁচামাল লিনিয়ার অ্যালকাইল বেনজিনে ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং ফ্লোট গ্লাস, টায়ার-টিউব ও রি-ফ্যাক্টরি cement শিল্পের কাঁচামালগুলোতেও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য করমুক্তি ও ব্যাংক হিসাবে সুবিধা
প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় শতভাগ করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন স্টার্ট-আপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এবং ফ্রিল্যান্সারদের ভ্যাট থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সাধারণ ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক আরোপের নিম্নসীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, একটি ব্যাংক হিসাব থেকে বছরে মাত্র একবার আবগারি শুল্ক কাটা হবে। সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্রাহকরা ৫ শতাংশ কর রেয়াত বা সুবিধা পাবেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 













