
ছোটবেলায় ভারতীয় একটা চলচ্চিত্র খুবই পছন্দের ছিলো। হিন্দি ভাষা না বুঝলেও টেলিভিশনে চলচ্চিত্রটি দিলেই দেখতে বসতাম। প্রতিমাসে কম করে হলেও দুইবার চলচ্চিত্রটি দেখতাম। এখন অবধি শতাধিকবার তো দেখা হয়েছেই। অতিরিক্ত মারামারি এবং নায়কের চমৎকার অঙ্গভঙ্গি মুগ্ধ করতো। তাঁর কিছু অঙ্গভঙ্গি স্কুলে গিয়ে করার চেষ্টা করতাম। ভাষা না বুঝলেও যা বুঝতাম তার যে বিষয়টি আমায় আকর্ষণ করতো তা হলো নায়কের দেশপ্রেম। তিনি দেশকে খুবই ভালোবাসতেন। দেশের উন্নতি চাইতেন এবং একসময় উন্নতি করে
ও ফেলেন। বড় হবার পর যখন হিন্দি বুঝতে শুরু করলাম তখন একবার ইচ্ছা করলো চলচ্চিত্রটি দেখে কাহিনী বোঝার। দেখে তো একটু শান্তি লাগলো। অনুমান কিছুটা ঠিক ছিলো। নায়কের দেশপ্রেম ছিলো অতিরিক্ত।
কাহিনী ছিলো, একজন ভারতীয় আমেরিকায় পড়াশোনা শেষে যেখানে ব্যবসা শুরু করেন। এক পর্যায়ে তাঁর মনে হয়, তিনি তাঁর দেশের জন্য কিছু করছেন না। তাই তিনি দেশে ফেরত আসেন এবং দেশের মানুষের জন্য কিছু চান। সেই উপলক্ষ্যে একটা নৈশভোজের আয়োজন করেন এবং দেশের সব বড় বড় ব্যবসীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি তাদের তাঁর পরিকল্পনার কথা জানান। সেই অনুষ্ঠানে পরিচিত হয় ভিলেনের সাথে। ভিলেন তাকে পরের দিন তাঁর অফিসে ডাকেন। নায়ক গেলে ভিলেন জানায় দেশের জন্য তার ইচ্ছাকে তিনি সম্মান করেন কিন্তু তিনি দেশের মানুষের জন্য যা করতে চান তা ভিলেন ব্যবসায়িকভাবে করছেন দীর্ঘদিন থেকে। তাই নায়কের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ভিলেনের ব্যবসায়িক লস হবে। তাই তিনি যেন অন্যকিছু নিয়ে নতুন করেন ভাবেন তার জন্য নায়ককে অনুরোধ করেন। ভিলেন কিছু ব্যবসায়িক খাত দেখিয়েও দেন। কিন্তু নায়কের পছন্দ হয় না। তিনি নিজ অর্থ এবং ব্যাংক লোন নিয়ে নিজের কাজ শুরু করেন। ভিলেন এতে চড়াও হয় এবং মন্ত্রীর মাধ্যমে তাঁর কাজ বন্ধ করে দেন। নায়কের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। বলতে গেলে নায়ক পথের ভিখারি হয়ে যান। এখানে চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরে যায়। নায়ক বুঝে যান এ দেশে সৎভাবে জনগণের জন্য কেউ কিছু করতে চাইলে তাকে বাধা দিবেই। তাই তিনি অন্য পথ বেছে নেন। তিনি জানতে পারেন ভিলেন তাঁর আয়কৃত অর্থের সঠিক ট্যাক্স পরিশোধ করে না। তাই তিনি পরিচয় লুকিয়ে ভিলেনকে জানিয়ে দেন আজ রাতে ইনকাম ট্যাক্সের লোকজন তার বাড়িতে তদন্তের জন্য যাবে তিনি যেন সব অবৈধ সস্পদের হিসাবের কাগজ সরিয়ে ফেলেন। ভিলেন তাই করে। নায়ক ব্যাপক মারামারি করে সেই কাগজ নিজের দখলে নেয় এবং শতকোটি টাকার জন্য কাগজগুলো ফেরত দিতে রাজি হয়। ভিলেন মেনে নেয়। টাকা দেবার সময়ও সেইরকম দুদার্ন্ত মারামারি করে নায়ক। ভিলেনের কাছে শতকোটি টাকা পাবার পর নায়ক খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন সারা ভারতে এরকম প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা। নায়ক সবার কাছে থেকে সেইসকল টাকার একটা অংশ নিয়ে নেয়। এখানেও মারামারির দৃশ্য অসাধারণ। হাজারকোটি টাকা পাবার পর নায়ক সেইসব টাকা সুন্দরভাবে আমেরিকায় পাঁচার করে দেয় এবং একটি মানব কল্যাণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর আমেরিকা গিয়ে তাঁর পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের পাঁচারকৃত সকল টাকা দিয়ে তাদের বলেন— এসব টাকা তার যেন তাদের পরিচিতদের মাধ্যমে সারাবিশে^ ছড়িয়ে দিয়ে ছোট ছোট পরিমাণে ভাগ করে অনুদান হিসেবে নায়কের মানবকল্যাণ সংস্থায় পাঠানো হয়। তারা তা করেন। ছোট এই কাজেই একদিকে যেমন হিসাব থাকলো তেমনি অন্যদিকে অনুদানের জন্য সরকারে ট্যাক্সও দিতে হলো না। একঢিলে দুই পাখি। তারপরের কাহিনী আরোও দুদার্ন্ত। পুরো কাহিনী বললে যারা চলচ্চিত্রটি দেখেননি তাদের আর দেখার আগ্রহ থাকবে না জন্য এড়িয়ে গেলাম। বলছিলাম সুপার স্টার রজনীকান্ত অভিনীত ২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তামিল চলচ্চিত্র ‘শিবাজি — দ্য বস’ চলচ্চিত্রের কথা।
‘শিবাজি — দ্য বস’ নির্তান্ত একটি কল্পকাহিনী হলেও প্রায় দেড় যুগ পর বাংলাদেশ এই পুরো ব্যাপারটিকে খুবই গুরত্বের সাথে উপলদ্ধি করছে এবং তার প্রয়োগ করার চেষ্টা করছেন। আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে এমন কোন কোন প্রার্থীকে দেখা যাচ্ছে নির্বাচনের প্রচারণাবাবদ নির্বাচন কমিশন অনুমোদিত যে সব্বোর্চ ৪৬ লাখ টাকার কথা বলা হয়েছে — সেই ব্যয়ের অর্থ তাদের কাছে নেই। তাই তারা জনগণের কাছে অনুদান দেবার জন্য আহ্বান করছেন। বিষয়টি এমন যে তাদের কাছে নিবার্চনে ব্যয় করার মতো কোন ধরণের অর্থ নেই। তারা ভীষণ গরীব, কিন্তু তাদের বুক ভরা দেশপ্রেম। তারা জনগণের টাকায় নিবার্চন করবে এবং নিবার্চিত হয়ে জনগণের জন্য কাজ করবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন কয়েকটি পোস্ট দেখার পর প্রথমেই মনে হয়েছিলো ‘শিবাজি — দ্য বস’। কেন বললাম? কারণ গত একমাস আগেও যে প্রার্থীর জনগণের কাছে কোন ধরণের অনুদান না নিয়ে লাখ টাকার ফোন ব্যবহার করেছেন, কোটি টাকার গাড়িতে ঘুরেছেন, পাঁচ তারকা হোটেলে রাত্রীযাপন করেছেন, বিমানে চড়েছেন, শতাধিক গাড়ি নিয়ে শোডাউন করেছেন, বিদেশ ভ্রমণে গেছেন, বিদেশে লেখাপড়া করেছেন, সারাদেশে প্রচারণা চালিয়েছেন — তার কাছে নির্বাচনে ব্যয় করার মতো মাত্র ৪৬ লাখ টাকা নেই? এই সামান্য টাকা তাকে কোন ব্যবসায়ীও অনুদানবাবদ দিলো না কিংবা দিবে না? এখানে গিয়ে থেমে যেতে হয়। আসলে অতীতে তারা যে সকল খরচ করেছেন কিংবা নানাভাবে অঢেল টাকা পেয়েছেন — তা ঠিক কিভাবে পেলেন, কে দিলেন, কেন দিলো — এসব প্রশ্নের উওর কাউকে দিতে হয়নি। কিছু সাংবাদিক জানার চেষ্টা করলেও তারা সেইসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। এখন তারা জনগণের কাছে পাঁচ টাকা, দশটাকা করে অনুদান চাচ্ছেন — এর প্রধান কারণ হলো — কালো টাকা, সাদা করা এবং নির্বাচন কমিশনকে বৈধ টাকা দেখানো কিংবা টাকার পথ অথবা সোর্স দেখানো। এইসময় এসে মিলে যায় ‘শিবাজি — দ্য বস’ এর পথ। জনগণ যা দিবে, দিক। কিন্তু তাদের কাছে অতীতে যেসকল ব্যবসায়ীরা সহযোগিতাবাবদ অর্থ দিয়েছিলেন সেই অঢেল টাকার কিছু বৈধ করা হোক। যেহেতু জনগণের কাছে অনুদান আহ্বান করা হয়েছে, কাঙ্খিত টাকার যোগানের পরও তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা আসতে থাকবে। টাকার পরিমাণ কোটি টাকা পার করার পরেও নিবার্চন কমিশন কিংবা ইনকাম ট্যাক্স কাউকেই কোন ধরণের জবাবদিহিতা করতে হবে না। অনুদান কেউ দিতে চাইলে রুখবো কিভাবে? কেউ তো বড় অংকের টাকা অনুদান দিচ্ছে না। সব ছোট ছোট অংক। ৫/৭/১০/২০/৩০/৫০/১০০……। আর বড় অংকের দিলেও সমস্যা নেই। সুবিধা নিয়ে সুবিধাবাবদ কোটি টাকা দিয়ে ব্যবসায়ী বলবেন খুশি হয়ে অনুদান দিয়েছি, আর প্রার্থী বলবেন — সব শক্তি আমার জনগণ। এভাবে এই নির্বাচনকে সামনে রেখে একজন প্রার্থী এককোটি করে অবৈধ টাকা বৈধ করলে ৩০০ আসনে বৈধ হবে ৩০০ কোটি। ৩০০ কোটি বৈধ হলো আর অবৈধ ৩০০ কোটি খরচ হলো। যার কোন হিসাব কোনকালে ছিলো না, থাকবে না। সহজ প্রক্রিয়া কিন্তু কঠিন সমীকরণ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 













