শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

“ক্ষমতার ঊর্ধ্বে মানুষের জয়”- বিমল সরকার

পৃথিবী আজ প্রযুক্তিতে উন্নত, তথ্যের বেগে ত্বরান্বিত, অথচ মানুষের অন্তর্দহন যেন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে গভীর। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছে, অর্থনীতি বিস্তৃত হয়েছে, বিশ্বরাজনীতি নতুন মানচিত্র পেয়েছে তবু প্রশ্ন রয়ে গেছে: মানুষ কি সত্যিই মানুষ হয়ে উঠেছে? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজকের সম্পাদকীয়টির নাম দিলাম “মানবতার আলো।” সভ্যতার ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রতিটি অন্ধকার যুগের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে একটি দীপশিখা। যখন ক্ষমতা মানুষের উপরে চেপে বসেছে, তখন কোনো এক নির্ভীক কণ্ঠ বলেছে, মানুষই শেষ সত্য। যখন বিভাজন ছড়িয়ে পড়েছে ধর্মে, জাতিতে, মতাদর্শে, তখন কোনো এক বিবেক জেগে উঠে বলেছে মানবতা বিভাজনের ঊর্ধ্বে।আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয় যার নাম নৈতিকতা । আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিই, দ্রুত বিচার করি, দ্রুত রায় দিই; কিন্তু স্থির চিত্তে শুনতে ভুলে যাই। ধীরস্থির ভাবতে ভুলে যাই। প্রজ্ঞার আলো দিয়ে ক্ষমা করতেও ভুলে যাই।মানবতার আলো ঠিক সেখানেই প্রয়োজন যেখানে মানুষ মানুষকে সন্দেহ নয়, সহমর্মিতায় দেখে। রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রে নয় বরং তার ন্যায়বোধে। রাজনীতির সাফল্য তার প্রচারে নয়, তার সততায়। নেতৃত্বের মহিমা তার জনপ্রিয়তায় নয়, তার বিবেকের দৃঢ়তায়। ইতিহাসের আদালতে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার হিসাব নয়, নৈতিকতার হিসাবই টিকে থাকে। আমরা ভুলে যাই প্রতিটি নাগরিক একেকটি অদৃশ্য সংগ্রামের যাত্রী। যে হাসছে, সে হয়তো ভেতরে ভেঙে পড়েছে। যে নীরব, উত্তরের অপেক্ষায় সে হয়তো হাজারো প্রশ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে। তাই মানবতার আলো মানে অন্যের বেদনা অনুভব করার সাহস। আজ যখন সামাজিক যোগাযোগের ভাষা হয়ে উঠছে তীক্ষ্ণ, যখন মতভেদ পরিণত হচ্ছে বিদ্বেষে, তখন আমাদের আরও বেশি প্রয়োজন সংযমের, আরও বেশি প্রয়োজন সহনশীলতার। শক্তি মানে যেখানে আঘাত নয় বরং সংযত থাকা। মানবতার আলো মানে সত্য কথাটাই বলা যদিও তা শুনতে অপ্রিয়।যদিও প্রত্যাশাহীন ভালোবাসা দেওয়া কিংবা ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো কঠিন, তবুও । আমরা যদি সত্যিই একটি উন্নত ভবিষ্যৎ চাই, তবে উন্নয়নকে কেবল সড়ক, সেতু, অট্টালিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। উন্নয়ন হতে হবে হৃদয়েরও। শিক্ষা যেখানে শুধু ডিগ্রির জন্য নয়, চরিত্রের জন্যেও অতীব প্রয়োজন । সময়ের অনবরত ঢেউ সবকিছু বদলে দেয় সেটা ক্ষমতা, অবস্থান কিংবা পরিচয় যাই হোক না কেন তবে মানবতার আলো বদলায় না। যে ব্যক্তি, যে সমাজ, যে রাষ্ট্র এই আলো ধারণ করে, তারাই টিকে থাকে দীর্ঘ ইতিহাসের পরীক্ষায়। আজ নতুন কোনো স্লোগান নয় কিংবা নতুন কোনো বিভাজন নয় বরং প্রয়োজন একটি সম্মিলিত প্রতিজ্ঞা: আমরা ভিন্ন হতে পারি কিন্তু অমানবিক হবো না। আমরা মতভেদে ভিন্ন হতে পারি কিন্তু ন্যায়ে বিভ্রান্ত হবো না। মানবতার আলো নিভে গেলে সভ্যতা কেবল কাঠামো হয়ে যায়; কিন্তু সেই আলো জ্বলে থাকলে মানুষই হয়ে ওঠে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্ম। এই সম্পাদকীয়ের শেষে কালের চিঠি পাঠকদের কাছে একটাই আহ্বান জানায় “ এসো নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটি আলোর প্রদীপ জ্বালাই ।কারণ অন্ধকার কখনো নিজে সরে যায় না; একটি ছোট আলোর কনাও তাকে পরাজিত করে।

জনপ্রিয়

“ক্ষমতার ঊর্ধ্বে মানুষের জয়”- বিমল সরকার

“ক্ষমতার ঊর্ধ্বে মানুষের জয়”- বিমল সরকার

প্রকাশের সময়: ০৪:১৭:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পৃথিবী আজ প্রযুক্তিতে উন্নত, তথ্যের বেগে ত্বরান্বিত, অথচ মানুষের অন্তর্দহন যেন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে গভীর। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছে, অর্থনীতি বিস্তৃত হয়েছে, বিশ্বরাজনীতি নতুন মানচিত্র পেয়েছে তবু প্রশ্ন রয়ে গেছে: মানুষ কি সত্যিই মানুষ হয়ে উঠেছে? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজকের সম্পাদকীয়টির নাম দিলাম “মানবতার আলো।” সভ্যতার ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রতিটি অন্ধকার যুগের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে একটি দীপশিখা। যখন ক্ষমতা মানুষের উপরে চেপে বসেছে, তখন কোনো এক নির্ভীক কণ্ঠ বলেছে, মানুষই শেষ সত্য। যখন বিভাজন ছড়িয়ে পড়েছে ধর্মে, জাতিতে, মতাদর্শে, তখন কোনো এক বিবেক জেগে উঠে বলেছে মানবতা বিভাজনের ঊর্ধ্বে।আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয় যার নাম নৈতিকতা । আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিই, দ্রুত বিচার করি, দ্রুত রায় দিই; কিন্তু স্থির চিত্তে শুনতে ভুলে যাই। ধীরস্থির ভাবতে ভুলে যাই। প্রজ্ঞার আলো দিয়ে ক্ষমা করতেও ভুলে যাই।মানবতার আলো ঠিক সেখানেই প্রয়োজন যেখানে মানুষ মানুষকে সন্দেহ নয়, সহমর্মিতায় দেখে। রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রে নয় বরং তার ন্যায়বোধে। রাজনীতির সাফল্য তার প্রচারে নয়, তার সততায়। নেতৃত্বের মহিমা তার জনপ্রিয়তায় নয়, তার বিবেকের দৃঢ়তায়। ইতিহাসের আদালতে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার হিসাব নয়, নৈতিকতার হিসাবই টিকে থাকে। আমরা ভুলে যাই প্রতিটি নাগরিক একেকটি অদৃশ্য সংগ্রামের যাত্রী। যে হাসছে, সে হয়তো ভেতরে ভেঙে পড়েছে। যে নীরব, উত্তরের অপেক্ষায় সে হয়তো হাজারো প্রশ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে। তাই মানবতার আলো মানে অন্যের বেদনা অনুভব করার সাহস। আজ যখন সামাজিক যোগাযোগের ভাষা হয়ে উঠছে তীক্ষ্ণ, যখন মতভেদ পরিণত হচ্ছে বিদ্বেষে, তখন আমাদের আরও বেশি প্রয়োজন সংযমের, আরও বেশি প্রয়োজন সহনশীলতার। শক্তি মানে যেখানে আঘাত নয় বরং সংযত থাকা। মানবতার আলো মানে সত্য কথাটাই বলা যদিও তা শুনতে অপ্রিয়।যদিও প্রত্যাশাহীন ভালোবাসা দেওয়া কিংবা ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো কঠিন, তবুও । আমরা যদি সত্যিই একটি উন্নত ভবিষ্যৎ চাই, তবে উন্নয়নকে কেবল সড়ক, সেতু, অট্টালিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। উন্নয়ন হতে হবে হৃদয়েরও। শিক্ষা যেখানে শুধু ডিগ্রির জন্য নয়, চরিত্রের জন্যেও অতীব প্রয়োজন । সময়ের অনবরত ঢেউ সবকিছু বদলে দেয় সেটা ক্ষমতা, অবস্থান কিংবা পরিচয় যাই হোক না কেন তবে মানবতার আলো বদলায় না। যে ব্যক্তি, যে সমাজ, যে রাষ্ট্র এই আলো ধারণ করে, তারাই টিকে থাকে দীর্ঘ ইতিহাসের পরীক্ষায়। আজ নতুন কোনো স্লোগান নয় কিংবা নতুন কোনো বিভাজন নয় বরং প্রয়োজন একটি সম্মিলিত প্রতিজ্ঞা: আমরা ভিন্ন হতে পারি কিন্তু অমানবিক হবো না। আমরা মতভেদে ভিন্ন হতে পারি কিন্তু ন্যায়ে বিভ্রান্ত হবো না। মানবতার আলো নিভে গেলে সভ্যতা কেবল কাঠামো হয়ে যায়; কিন্তু সেই আলো জ্বলে থাকলে মানুষই হয়ে ওঠে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্ম। এই সম্পাদকীয়ের শেষে কালের চিঠি পাঠকদের কাছে একটাই আহ্বান জানায় “ এসো নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটি আলোর প্রদীপ জ্বালাই ।কারণ অন্ধকার কখনো নিজে সরে যায় না; একটি ছোট আলোর কনাও তাকে পরাজিত করে।