
পর্যালোচনায়: ওয়াজেদ হোসেন জীম ‘চরকি’তে ৩৫ টাকায় দেখলাম প্রসূন রহমান পরিচালিত ‘প্রিয় সত্যজিৎ’। একঘন্টা পনেরো মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি আমায় নির্বাক এবং সবাক – দুই চলচ্চিত্রের স্বাদ দিয়েছে। সত্যজিৎ রায় এবং তারেক মাসুদ – এই দুই গুণী পরিচালককেই সম্মান জানানো যায় এই একটি চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে। কাহিনী সংক্ষেপে, চলচ্চিত্র পরিচালক আসিফ মাহমুদ, যিনি তার জীবনের মিড লাইফ ক্রাইসিস টাইম পার করছিলেন। একাকীত্ব জীবনে তখনো পুরোপুরি প্রবেশ করেন নি। বই পড়ে, ফুল গাছের যত্ন নিয়ে সময় কেটে যায়। পত্রিকায় টুকটাক লেখালেখিও করেন। শুভাকাঙ্খীদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে, ভক্তদের আনাগোনা কমে গেছে প্রায়। এমন একদিনে একজন তরুণ পরিচালক তার বাসায় আসেন তার সাথে দেখা করতে। নাম ‘অপরাজিতা’। পড়াশোনা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। পরিচালক আসিফ মাহমুদের কাছে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাকে নিয়ে যেতে চান সত্যজিৎ রায়ের আদি পুরুষের জন্মস্থান মসুয়া গ্রামে। এই গ্রামে যাবার পথেই চলচ্চিত্রটি সিংহভাগ অংশ। অপরাজিতা জানতে চান পরিচালক আসিফ মাহমুদের যাবিত জীবন। চলন্ত গাড়িতে কেটে পড়া গ্রামের দিকে তাকিয়ে পরিচালক আসিফ মাহমুদ বলতে থাকেন জীবনের কথা। সেই জীবন যে জীবনের অনেকাংশ অনিচ্ছাকৃতভাবে মিলে যায় সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত ‘পথের পাঁচালী’র আপুর সাথে। আসিফ মাহমুদ যিনি চেষ্টায় থাকেন সেই জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে কিন্তু একবার যদি সত্যজিৎ রায়ের ‘অপু ইফেক্ট’ কারো জীবনে আসে তবে তা থেকে মুক্তি কি এত সহজেই হয়? পরিচালক প্রসূন রহমান পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি দর্শকের মনোজগতে নাড়া দিবে। কখনও মনে হবে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত চলচ্চিত্র দেখছেন আবার কখনও মনে হবে কোন নির্বাক চলচ্চিত্র। পুরো চলচ্চিত্র দেখার পর দর্শক উপলব্ধি করতে পারবেন, নিরবতা আমাদের জীবনের কত গুরুত্বপূর্ণ এবং মাঝে মাঝে কেন আমাদের নিরব থাকতে হয় অথবা থাকা উচিত। চলচ্চিত্রটির প্রবাহ সঙ্গীত শুনে দর্শক বিভোর হয়ে যাবেন। প্রবাহ সঙ্গীতের প্রবাহে কখন চলচ্চিত্রটি শেষ হয়ে যাবে দর্শক বুঝতেই পারবেন না। শেষ হবার পরে বেশ কয়েকটা দিন একরকম ঘোরের মাঝে কেটে যাবে। কেউ কেউ ঘোর কাটিয়ে উঠতে আবারও দুইতিনবার চলচ্চিত্রটি দেখবেন। ‘ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ উপদেশের পাশাপাশি ‘প্রিয় সত্যজিৎ’ চলচ্চিত্রটি দেখতে কিছু নিয়ম দেয়া প্রয়োজন ছিলো। যেমন এই চলচ্চিত্রটি দেখতে হবে একা। মধ্যরাতে কানে হেডফোন লাগিয়ে অথবা নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় বসে অথবা ভোর রাতে সাগর পাড়ে শুয়ে। তবেই চলচ্চিত্রটির আসল স্বাদ আস্বাদন করা যাবে। একজন পরিচালক তার জীবনদশায় অগণিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও হাতে গোণা কয়েকটি চলচ্চিত্র থাকে যা তাকে স্মরণীয় করে রাখতে পারে। ‘প্রিয় সত্যজিৎ’ পরিচালক প্রসূন রহমান পরিচালিত এমনি একটি সৃষ্টি। প্রেম, যুদ্ধ, অতি কাল্পনিক, অতি রঞ্জিত, আধা ভৌতিক গাল গল্প ছাড়াও যে জীবনদর্শন নিয়ে এত চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায় তার স্বাক্ষর তিনি রেখেছেন ‘প্রিয় সত্যজিৎ’ এ। সর্বাধিক প্রচারে, দর্শকদের গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনায় চলচ্চিত্রটির ব্যাপকতা অবশ্যই বাড়বে। বাড়বে জনপ্রিয়তা। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও এগিয়ে থাকবে অনেক। চলচ্চিত্রটিতে পরিচালক আসিফ মাহমুদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেতা ‘রুবেল আহমেদ’, যার অভিনয়, ভারী কন্ঠ এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অন্যমাত্রা যোগ করেছে। অন্যদিকে, ‘অপরাজিতা’র চরিত্রে অভিনয় করেছেন ‘মৌটুসী বিশ্বাস’, যার কথা বলার ধরণ, কৌতুহল প্রকাশ এবং আবেগ সংবেদনশীল চাহনি দর্শককে মুগ্ধ করবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 













