
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’– এই অমর পঙ্ক্তির স্মৃতি নিয়ে আবার এলো ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্মৃতির গৌরবমাখা মাসের দিন গণনা আজ শুরু হলেও এবার পরিবেশ একটু ভিন্ন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে অমর একুশে বইমেলা আজ থেকে হচ্ছে না। মেলা শুরু হবে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায় তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। এতে শহীদ হন বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অনেকে।
ভাষা আন্দোলনের সেই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি অর্জন করে মাতৃভাষার অধিকার। একই সঙ্গে ভাষার দাবি পরিণত হয় রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হয় বাঙালির শোষণমুক্তির সংগ্রাম, যার ধারাবাহিকতায় আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গের এই বিরল ইতিহাস আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। সেদিন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর পর থেকে দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে।
ভাষার মাসের প্রথম দিন আজ থেকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচির আয়োজন করছে। ফেব্রুয়ারি মাস বাঙালির জন্য শোক, গৌরব ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক; যে মাস ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার ইতিহাসকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
আজ প্রতীকী বইমেলা
আজ রোববার প্রতীকী বইমেলা বসছে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চ চত্বরে। সকাল সাড়ে ১০টায় মেলার উদ্বোধন হবে। চলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত। একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ এই মেলার আয়োজন করেছে। মেলায় অর্ধশত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংগঠন অংশগ্রহণ করেছে। মেলায় অমর একুশের গান, আবৃত্তি, নাটক, বক্তৃতা চলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত। একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ তথা সরকার অমর একুশে বইমেলার ধারাবাহিকতা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভঙ্গ করে ১ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে এ বছর ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারের এ সিদ্ধান্ত দেশের হাজারো লেখক, শিক্ষার্থী, পাঠক, সৃজনশীল প্রকাশক, সংস্কৃতিকর্মীসহ ব্যাপক জনগণকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে। একুশের বইমেলা এ দেশের মানুষের স্বাধীনতা, স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বায়ান্নর ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও একুশের চেতনাকে ধারণ করে প্রতিবছর মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলা আড়ম্বরের সঙ্গে ১ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়। দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় অমর একুশে বইমেলা আজ বিশ্বপরিসরেও প্রতিষ্ঠিত এবং গুরুত্ব অর্জন করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া সেই মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রকাশ। ২০২৬-এ নির্ধারিত সময়ে বইমেলা করতে না পারা জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
প্রতীকী বইমেলায় যোগদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে– দি রিয়েল পাবলিশার্স, সৃজনী, জ্ঞান বিতরণী, নবরাগ প্রকাশনী, অনুজ প্রকাশন, বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, বঙ্গজ প্রকাশন, অন্যপ্রকাশ, কাকলী প্রকাশনী, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, আদিত্য অনীক, অনন্যা, ভিন্নচোখ, তক্ষশীলা, জাগৃতি, শব্দবাড়ি প্রকাশনা, দশমিক, কেন্দ্রবিন্দু, কলি প্রকাশনী, চিলেকোঠা পাবলিকেশন, লালন বিশ্ব সংস্থা, সৌম্য প্রকাশন, লাল পিঁপড়ে, উদীচী, ভ্যানগার্ড পাবলিকেশন, মনুষ্যত্ব বিকাশ কেন্দ্র, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, নরসুন্দা প্রকাশনী, নতুন দিগন্ত, আকাশ, সূচীপত্র, আবিষ্কার, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, অনুপম প্রকাশনী, পাঠক সমাবেশ, অনিন্দ্য প্রকাশ, ছায়াবীথি, কৌমুদী প্রকাশনী।
গতকাল শনিবার বিকেলে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চের মেলা স্থান পরিদর্শন করেন পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মফিজুর রহমান লালটু, প্রকাশক ও লেখক সাঈদ বারীসহ পরিষদের নেতারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 













