বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গণহত্যা দিবসে গাইবান্ধায় আলোর মিছিল

২৫ মার্চের কালরাত— বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ ও কলঙ্কিত হত্যাযঙ্গের অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যা কেবল একটি জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়নি, রেখে গেছে অসংখ্য বধ্যভূমি ও গণকবর, যা আজও সেই নৃশংসতার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও দেশের বহু বধ্যভূমি-গণকবর এখনো অবহেলা ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। তাই এসব স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এখন শুধু সময়ের দাবি নয় বরং এক অনিবার্য জাতীয় দায়বদ্ধতা।

 

কালরাত ও জাতীয় গণহত্যা দিবস এবং গাইবান্ধা স্টেডিয়াম সংলগ্ন বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবিতে গাইবান্ধায় প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনা, কবিতা, গণসংগীত ও আলোর মিছিল কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী এবং বক্তারা এসব কথা বলেন।

 

বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সাড়ে চারটায় গাইবান্ধা পৌর শহিদ মিনার চত্বরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয় শহীদদের প্রতি। পরে দেশাত্মবোধক গান, কবিতা আবৃত্তি, গণসংগীত ও আলোচনা সভায় বক্তারা ২৫ মার্চের ভয়াল স্মৃতি তুলে ধরেন এবং নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার আহ্বান জানান।

 

এ্যাড. মুরাদ জামান রব্বানীর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গাইবান্ধা জেলা সাবেক কমান্ডার মাহামুদুল হক শাহাজাদা, রাজনীতিবিদ ওয়াজিউর রহমান রাফেল, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জহুরুল কাইয়ুম, রাজনীতিক মিহির ঘোষ, গোলাম রব্বানী, নারীনেত্রী রিক্তু প্রসাদ, শহীদ পরিবারের সদস্য প্রবীর চক্রবর্তী, জয়া প্রসাদ, রামকৃষ্ণসহ অনেকে।

 

বক্তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক রাষ্ট্র গঠন করা— যেখানে ইতিহাস ও ত্যাগের স্মৃতি যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষিত থাকবে।

 

তারা আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বধ্যভূমি-গণকবরগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে চিহ্নিত নয় বা যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। অনেক জায়গা দখল, অবহেলা কিংবা অজ্ঞতার কারণে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব স্থান শুধু অতীতের স্মৃতি নয় বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

 

আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় একটি আলোর মিছিল শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে স্টেডিয়াম সংলগ্ন গাইবান্ধার প্রধান বধ্যভূমিতে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।

 

সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, বধ্যভূমিগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ, সঠিকভাবে চিহ্নিতকরণ, স্মৃতিফলক স্থাপন এবং ইতিহাসভিত্তিক তথ্য সংযোজন জরুরি। পাশাপাশি এসব স্থানকে শিক্ষামূলক ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

 

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে যে ত্যাগ ও সংগ্রাম রয়েছে, তার অন্যতম নীরব সাক্ষী এই বধ্যভূমিগুলো। তাই এগুলোর সংরক্ষণ কেবল অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা নয়—এটি একটি দায়িত্বশীল জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব ও ইতিহাস রক্ষার অঙ্গীকারও বটে।

 

 

 

জনপ্রিয়

গণহত্যা দিবসে গাইবান্ধায় আলোর মিছিল

প্রকাশের সময়: ০৪:০৩:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬

২৫ মার্চের কালরাত— বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ ও কলঙ্কিত হত্যাযঙ্গের অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যা কেবল একটি জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়নি, রেখে গেছে অসংখ্য বধ্যভূমি ও গণকবর, যা আজও সেই নৃশংসতার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও দেশের বহু বধ্যভূমি-গণকবর এখনো অবহেলা ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। তাই এসব স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এখন শুধু সময়ের দাবি নয় বরং এক অনিবার্য জাতীয় দায়বদ্ধতা।

 

কালরাত ও জাতীয় গণহত্যা দিবস এবং গাইবান্ধা স্টেডিয়াম সংলগ্ন বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবিতে গাইবান্ধায় প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনা, কবিতা, গণসংগীত ও আলোর মিছিল কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী এবং বক্তারা এসব কথা বলেন।

 

বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সাড়ে চারটায় গাইবান্ধা পৌর শহিদ মিনার চত্বরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয় শহীদদের প্রতি। পরে দেশাত্মবোধক গান, কবিতা আবৃত্তি, গণসংগীত ও আলোচনা সভায় বক্তারা ২৫ মার্চের ভয়াল স্মৃতি তুলে ধরেন এবং নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার আহ্বান জানান।

 

এ্যাড. মুরাদ জামান রব্বানীর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গাইবান্ধা জেলা সাবেক কমান্ডার মাহামুদুল হক শাহাজাদা, রাজনীতিবিদ ওয়াজিউর রহমান রাফেল, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক জহুরুল কাইয়ুম, রাজনীতিক মিহির ঘোষ, গোলাম রব্বানী, নারীনেত্রী রিক্তু প্রসাদ, শহীদ পরিবারের সদস্য প্রবীর চক্রবর্তী, জয়া প্রসাদ, রামকৃষ্ণসহ অনেকে।

 

বক্তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক রাষ্ট্র গঠন করা— যেখানে ইতিহাস ও ত্যাগের স্মৃতি যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষিত থাকবে।

 

তারা আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বধ্যভূমি-গণকবরগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে চিহ্নিত নয় বা যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি। অনেক জায়গা দখল, অবহেলা কিংবা অজ্ঞতার কারণে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব স্থান শুধু অতীতের স্মৃতি নয় বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

 

আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় একটি আলোর মিছিল শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে স্টেডিয়াম সংলগ্ন গাইবান্ধার প্রধান বধ্যভূমিতে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।

 

সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, বধ্যভূমিগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ, সঠিকভাবে চিহ্নিতকরণ, স্মৃতিফলক স্থাপন এবং ইতিহাসভিত্তিক তথ্য সংযোজন জরুরি। পাশাপাশি এসব স্থানকে শিক্ষামূলক ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

 

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে যে ত্যাগ ও সংগ্রাম রয়েছে, তার অন্যতম নীরব সাক্ষী এই বধ্যভূমিগুলো। তাই এগুলোর সংরক্ষণ কেবল অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা নয়—এটি একটি দায়িত্বশীল জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব ও ইতিহাস রক্ষার অঙ্গীকারও বটে।