মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬, ৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গাইবান্ধায় তেল নিয়ে তেলেসমাতি কাণ্ড !

তাসলিমুল হাসান সিয়াম: গাইবান্ধায় জ্বালানি তেল সংকটকে কেন্দ্র করে জেলার পরিবহন খাতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন উপজেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দিনের বেলায় পাম্প বন্ধ রাখা এবং সন্ধ্যার পর সীমিত সময়ের জন্য তেল বিক্রির ফলে সাধারণ মানুষ ও চালকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার অজুহাত দেখানো হলেও বাস্তবে তেল বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

সোমবার (২৩ মার্চ) সন্ধ্যা ৭টা থেকে  শহরের দুইটি পাম্পে তেল বিক্রি শুরু হলে মুহূর্তেই শতাধিক যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয় যা  এ রিপোর্ট লেখার সময় ২৪ মার্চ দিবাগত রাত দেড়টার সময় পর্যন্ত চলমান ছিলো। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তেল দেওয়ায় চালকদের দৈনন্দিন জ্বালানি চাহিদা পূরণ হচ্ছে না, ফলে তাদের আয়-রোজগার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।


এদিকে সংকটের সুযোগ নিয়ে খোলা বাজারে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে । উপজেলা পর্যায়ের বেশ কয়েকটি পাম্প বেশি টাকার বিনিময়ে খোলাবাজারে তেল বিক্রি করছে । এতে পরিবহন চালকদের  তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে জারকিন বা ড্রামের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া তেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা একদিকে অবৈধ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

এছাড়া বিভিন্ন পাম্পে প্রভাবশালী বা পরিচিত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে তেল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারণ চালকেরা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও বঞ্চিত হচ্ছেন। দিনভর পাম্প বন্ধ রেখে সন্ধ্যায় হঠাৎ সীমিত পরিসরে তেল বিক্রির কারণে পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে।


পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সরবরাহ কমে যাওয়া আংশিক কারণ হলেও মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে তদারকির ঘাটতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়মের কারণে। যথাযথ মনিটরিং না থাকায় কিছু অসাধু চক্র পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।এই সংকটের প্রভাব পড়েছে জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। অনেক রুটে যানবাহন চলাচল কমে গেছে, ভাড়া বেড়েছে এবং কর্মজীবী মানুষদের নিয়মিত যাতায়াতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

কুরিয়ার সার্ভিসের মোটরসাইকেল চালক রাশেদুল ইসলাম জানান, ” সন্ধ্যার পর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর তিনি তেল পেয়েছি , দিনের বেলায় পাম্প বন্ধ থাকায় তারা গাড়ি চালাতে পারি না। আবার রাতে তেল নিতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে শারীরিক কষ্টও বাড়ছে। প্রতিদিন আয়ের বড় একটি অংশই হারিয়ে যাচ্ছে এই সংকটের কারণে ” ।
পিকআপ ভ্যান চালক বিপুল  হোসেন জানান, ” কয়েকটি পাম্পে তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে তেল কিনতে হয়েছে। স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ দাম দিয়ে তেল কিনে গাড়ি চালানো এখন আর লাভজনক থাকছে না। অনেক সময় গাড়ি বন্ধ রেখেই বসে থাকতে হচ্ছে।”

ফাহিম দেওয়ান নামের এক মোটরসাইকেল চালক জানান, ”  লাইনে আগে থাকলেও অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তির গাড়ি আগে তেল পেয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ চালকেরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং প্রতিবাদ করার সুযোগও পাচ্ছেন না।”
এদিকে, দূরপাল্লার এক ট্রাক চালক বলেন, তেল সংকটের কারণে সময়মতো পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতি হচ্ছে এবং চালকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানাও গুনতে হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “পেট্রোল পাম্পে অস্থিরতা নিরসনে আমরা কাজ করছি। গতকাল শহরের দুইটি ফিলিং স্টেশনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তেল বিক্রির  ব্যবস্থা করা হয়েছে। “

জনপ্রিয়

গাইবান্ধায় তেল নিয়ে তেলেসমাতি কাণ্ড !

প্রকাশের সময়: ০৮:০৫:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬

তাসলিমুল হাসান সিয়াম: গাইবান্ধায় জ্বালানি তেল সংকটকে কেন্দ্র করে জেলার পরিবহন খাতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন উপজেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দিনের বেলায় পাম্প বন্ধ রাখা এবং সন্ধ্যার পর সীমিত সময়ের জন্য তেল বিক্রির ফলে সাধারণ মানুষ ও চালকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার অজুহাত দেখানো হলেও বাস্তবে তেল বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

সোমবার (২৩ মার্চ) সন্ধ্যা ৭টা থেকে  শহরের দুইটি পাম্পে তেল বিক্রি শুরু হলে মুহূর্তেই শতাধিক যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয় যা  এ রিপোর্ট লেখার সময় ২৪ মার্চ দিবাগত রাত দেড়টার সময় পর্যন্ত চলমান ছিলো। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তেল দেওয়ায় চালকদের দৈনন্দিন জ্বালানি চাহিদা পূরণ হচ্ছে না, ফলে তাদের আয়-রোজগার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।


এদিকে সংকটের সুযোগ নিয়ে খোলা বাজারে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে । উপজেলা পর্যায়ের বেশ কয়েকটি পাম্প বেশি টাকার বিনিময়ে খোলাবাজারে তেল বিক্রি করছে । এতে পরিবহন চালকদের  তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে জারকিন বা ড্রামের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া তেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা একদিকে অবৈধ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

এছাড়া বিভিন্ন পাম্পে প্রভাবশালী বা পরিচিত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে তেল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারণ চালকেরা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও বঞ্চিত হচ্ছেন। দিনভর পাম্প বন্ধ রেখে সন্ধ্যায় হঠাৎ সীমিত পরিসরে তেল বিক্রির কারণে পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে।


পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সরবরাহ কমে যাওয়া আংশিক কারণ হলেও মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে তদারকির ঘাটতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়মের কারণে। যথাযথ মনিটরিং না থাকায় কিছু অসাধু চক্র পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।এই সংকটের প্রভাব পড়েছে জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। অনেক রুটে যানবাহন চলাচল কমে গেছে, ভাড়া বেড়েছে এবং কর্মজীবী মানুষদের নিয়মিত যাতায়াতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

কুরিয়ার সার্ভিসের মোটরসাইকেল চালক রাশেদুল ইসলাম জানান, ” সন্ধ্যার পর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর তিনি তেল পেয়েছি , দিনের বেলায় পাম্প বন্ধ থাকায় তারা গাড়ি চালাতে পারি না। আবার রাতে তেল নিতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে শারীরিক কষ্টও বাড়ছে। প্রতিদিন আয়ের বড় একটি অংশই হারিয়ে যাচ্ছে এই সংকটের কারণে ” ।
পিকআপ ভ্যান চালক বিপুল  হোসেন জানান, ” কয়েকটি পাম্পে তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে তেল কিনতে হয়েছে। স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ দাম দিয়ে তেল কিনে গাড়ি চালানো এখন আর লাভজনক থাকছে না। অনেক সময় গাড়ি বন্ধ রেখেই বসে থাকতে হচ্ছে।”

ফাহিম দেওয়ান নামের এক মোটরসাইকেল চালক জানান, ”  লাইনে আগে থাকলেও অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তির গাড়ি আগে তেল পেয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ চালকেরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং প্রতিবাদ করার সুযোগও পাচ্ছেন না।”
এদিকে, দূরপাল্লার এক ট্রাক চালক বলেন, তেল সংকটের কারণে সময়মতো পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতি হচ্ছে এবং চালকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানাও গুনতে হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “পেট্রোল পাম্পে অস্থিরতা নিরসনে আমরা কাজ করছি। গতকাল শহরের দুইটি ফিলিং স্টেশনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তেল বিক্রির  ব্যবস্থা করা হয়েছে। “