
বিমল সরকার: মানবসভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে নারী শুধু একটি সামাজিক পরিচয়ের নাম নন; তিনি সৃষ্টির আদিম উৎস, মানবতার অন্তর্লীন শক্তি এবং সংস্কৃতির চিরন্তন ধারক। পৃথিবীর প্রতিটি জীবনের সূচনালগ্নে যে স্নেহময় স্পর্শ মানবতার প্রথম ভাষা রচনা করে, তার নাম মা যার ডাক নাম নারী। এই নারীর হৃদয়েই জন্ম নেয় ভবিষ্যৎ, তার মমতার ভিতরেই গড়ে ওঠে সভ্যতার প্রথম বিদ্যালয়। তবু বিস্ময়ের বিষয়, ইতিহাসের বহু অধ্যায়ে নারীর অবদানকে অন্ধকারের আড়ালে ঠেলে দেওয়া হয়েছে; সমাজের রুদ্ধ অনুশাসন, কুসংস্কার ও ক্ষমতার অসম কাঠামো তার স্বপ্নের পরিধিকে সংকুচিত করেছে। তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি ইতিহাসের দীর্ঘ নীরবতার বিরুদ্ধে মানবতার এক জাগ্রত প্রশ্ন ,আমরা কি সত্যিই সমতার পৃথিবী নির্মাণ করতে পেরেছি?
আধুনিক বিশ্বে নারী তার সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। শিক্ষা, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা শিল্প ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক অঙ্গনে নারীর সৃজনশীলতা, মেধা ও নেতৃত্ব মানবসভ্যতাকে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতাও এর ব্যতিক্রম নয়। গ্রামীণ অর্থনীতির শিকড় থেকে নগর শিল্পায়নের প্রবাহ, শিক্ষাঙ্গনের মেধাবিকাশ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর দৃঢ় পদচারণা আজ জাতীয় অগ্রগতির এক অনিবার্য ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।
তবে এই অগ্রগতির দীপ্তিময় আলোর পাশেই কিছু অমোঘ ছায়া রয়ে গেছে। সমাজের বহু স্তরে এখনও নারীকে বৈষম্য, সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়। কোথাও বাল্যবিবাহের অন্ধকারে নিভে যায় কোন কিশোরীর স্বপ্ন, কোথাও কর্মক্ষেত্রে অসম মর্যাদা কিংবা পারিবারিক সংকীর্ণতার দেয়াল তার প্রতিভাকে বন্দী করে রাখে। এই বাস্তবতা আমাদের গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে নারীর অধিকার কোনো সাময়িক আন্দোলনের বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং সভ্যতার নৈতিক ভিত্তির এক অপরিহার্য প্রশ্ন। একটি সমাজ তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত ও সভ্য হয়ে ওঠে, যখন সেখানে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা, সমান নিরাপত্তা এবং সমান সুযোগের অধিকারী হন।
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় নারীর অবদান অনস্বীকার্য ও অনিবার্য। কৃষকের মাঠে তার পরিশ্রম, কারখানার কর্মচাঞ্চল্যে তার নিষ্ঠা, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে তার প্রজ্ঞা এবং প্রশাসনের দায়িত্বে তার নেতৃত্ব মিলে নারীর শ্রম ও মেধা আজ দেশের অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বিশেষ করে পোশাকশিল্পে লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিকের ত্যাগ, অধ্যবসায় ও সাহস বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক পরিসরে এক শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি একাই সমাজকে পূর্ণতা দেয় না; প্রয়োজন গভীর সামাজিক ও নৈতিক পরিবর্তনের। নারীর প্রতি প্রকৃত সম্মান শুধু আইনের বিধানে প্রতিষ্ঠিত হয় না, যা বিকশিত হয় পারিবারিক শিক্ষা, মানবিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক মূল্যবোধের ধারায়। একটি শিশুকে যদি শৈশব থেকেই শেখানো যায় যে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদার মানুষ, তবে ভবিষ্যতের সমাজ হবে অধিক মানবিক, অধিক ন্যায়ভিত্তিক এবং অধিক আলোকিত।
এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বও অপরিসীম। নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতি ও দৃঢ় বাস্তবায়ন অপরিহার্য। একই সঙ্গে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা সময়ের দাবি। কারণ একটি জাতির নৈতিক শক্তি নির্ধারিত হয় সে জাতি তার নারীকে কতখানি মর্যাদা দেয় তার উপর।
নারী দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতার আবরণে আবদ্ধ কোনো উৎসব নয়; এটি মানবিক বিবেকের এক গভীর আহ্বান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নারীর ক্ষমতায়ন মানেই সমাজের ক্ষমতায়ন, নারীর অগ্রগতি মানেই জাতির অগ্রগতি। একজন নারী যখন শিক্ষিত হন, তখন শুধু একজন ব্যক্তিই নয় বরং একটি পরিবার আলোকিত হয়; আর যখন একজন নারী আত্মনির্ভরশীল হন, তখন একটি জাতি আত্মবিশ্বাসে দীপ্ত হয়ে ওঠে।
তাই এই মহান দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক,সমতার আলোকমালায় উদ্ভাসিত একটি সমাজ নির্মাণ করা। এমন একটি সমাজ, যেখানে কোনো কন্যার স্বপ্ন পথের ধুলায় হারিয়ে যাবে না; যেখানে প্রতিটি নারী সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার পূর্ণ অধিকার নিয়ে তার জীবন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারবে।
কারণ নারীর অগ্রযাত্রা থেমে গেলে সভ্যতার পথও থেমে যায়। তাই নারী দিবসের এই প্রতিজ্ঞা হোক-মানবতার অর্ধেক আকাশকে তার প্রাপ্য মর্যাদা, সম্মান ও আলোর অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আন্তরিক অঙ্গীকার।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















