
তাসলিমুল হাসান সিয়াম: বাংলাদেশের উত্তরের জনপদ গাইবান্ধা এমন এক জেলা, যেখানে নদীর স্বভাব-চরিত্রই মানুষের জীবনের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ঘাঘট, করতোয়া, বাঙালীসহ নানা নদীর শাখা-প্রশাখায় ঘেরা গাইবান্ধার পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটি সংসদীয় আসনের বেশিরভাগ অংশজুড়ে রয়েছে বিশাল চরাঞ্চল। এই চরভূমিগুলো একদিকে উর্বর, অন্যদিকে চরম অনিশ্চয়তার প্রতীক। নদীভাঙন, নদীর খামখেয়ালিপনা এবং মৌলিক সুবিধার অভাবে এখানকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বছরের পর বছর জীবনসংগ্রামে লিপ্ত থাকে। গাইবান্ধার চরাঞ্চলে মানুষের জীবন নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। বছরের বেশ কিছু সময় পানিবন্দি হয়ে থাকা, বর্ষায় ঘরবাড়ি হারানো এবং শুষ্ক মৌসুমে নতুন চর জেগে উঠলে সেখানেই আবার ঘর তৈরি করা—এ যেন চরবাসীর প্রতিনিয়ত পুনরাবৃত্ত বাস্তবতা। ঘূর্ণায়মান এই জীবনযাত্রায় স্থায়ীভাবে বসতি, জমির মালিকানা ও আর্থিক নিরাপত্তা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।

শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক চর এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষক সংকট স্থায়ী সমস্যা। মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে দূরত্ব, নৌযান নির্ভরতা এবং বন্যার কারণে স্কুলে পৌঁছানো হাজারো শিশুর জন্য অস্বাভাবিকভাবে কঠিন।
স্বাস্থ্যসেবাও একই রকম সংকটাপন্ন। চরাঞ্চলে স্থায়ী হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসক না থাকায় অনেককে নদীপথে দূরবর্তী উপজেলা সদর বা জেলা শহরে যেতে হয়, যা জরুরি পরিস্থিতিতে অনেকের জীবন বাঁচানোর সুযোগ কমিয়ে দেয়। যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা চরবাসীর দৈনন্দিন জীবনকে আরও জটিল করে তোলে। কাঁচা রাস্তাঘাট, নদী পারাপারের ঝুঁকি এবং নৌযান নির্ভর চলাচল তাদের উন্নয়ন সম্ভাবনাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করে। নির্বাচনী সময়ে চরাঞ্চলের গুরুত্ব বাড়লেও ভোটের পর উন্নয়ন থমকে যায়।

নির্বাচন এলে গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল হঠাৎ করেই রাজনৈতিক দলের নজরকাড়া এলাকায় পরিণত হয়। প্রার্থীরা প্রচারে গিয়ে নদীভাঙন প্রতিরোধ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, সেতু-কালভার্ট, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, নির্বাচন শেষ হলে এসব প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়। স্থায়ী উন্নয়ন প্রকল্প না থাকায় চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান থেকে যায় একই জায়গায় কিংবা আরও পিছিয়ে যায় নতুন ভাঙনের কারণে।
স্থানীয় চরবাসীদের মন্তব্য::
ফুলছড়ি উপজেলার পশ্চিম খাটিয়ামারি চরের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “ভোটে সময় সবাই আসে। নদীভাঙন ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। অথচ বর্ষায় ঘরভাঙা শুরু হলে আর কাউকে পাওয়া যায় না। নদীর ভাঙন থামে না, আর নেতাদের প্রতিশ্রুতিও কাজে রূপ নেয় না।”
চর সিধাইয়ের নৌকা চালক নাসির উদ্দিন বলেন, “আমরা বছরের অর্ধেক সময় পানির ওপর ভাসি। কথা দেয় সাইক্লোন শেল্টার হবে, চরবাসীর জন্য ভালো স্কুল হবে—কিন্তু বছরের পর বছর গেলেও কিছুই হলো না। ভোটের সময় সবাই মানুষের খোঁজ নেয়, পরে আর কেউ দেখতে আসে না।”
কলেজ ছাত্রী মরিয়ম বলেন ,“ভোটের আগে আমাদের চরটা দেখে সবাই চমকে ওঠে—‘এতো কষ্টে মানুষ থাকে?’ সেই কষ্ট দূর করার কথাও বলে। কিন্তু ভোট শেষে আমরাই আবার ভুলে যাই যে কেউ আসবে।”
মানিককর চরের গৃহবধূ রাবেয়া বলেন, “হাসপাতাল নেই, ডাক্তার নেই। অসুস্থ হলে নৌকা নিয়ে দূরে যেতে হয়। নেতারা বলে চিকিৎসা কেন্দ্র হবে, কিন্তু সেই কথা শুধু ভোটের সময়ই শোনা যায়।”
প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ঘাটতি : গাইবান্ধার বিভিন্ন আসনের প্রার্থীরা চরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে নানা পরিকল্পনার কথা বলছেন। কেউ নদীশাসনের স্থায়ী প্রকল্পের মাধ্যমে নদীভাঙন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন। কেউ চর এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব উল্লেখ করছেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর জন্য কৃষিনির্ভর শিল্প, চরভিত্তিক পশুপালন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি করার কথাও তারা বলছেন।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, চরাঞ্চলের পরিবর্তন সম্ভব হবে কেবল তখনই, যখন এসব প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত হবে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা, বিশেষ বাজেট এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর সমন্বয়। চর উন্নয়ন–সংস্থাদের দৃষ্টিভঙ্গি চর নিয়ে কাজ করা ইয়ুথ এলায়েন্সের পরিচালক মারুফ হাসানের মতে, প্রান্তিক মানুষের চাহিদা এখন আর শুধু ত্রাণ বা দুর্যোগের সময় অস্থায়ী সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়।তাদের প্রয়োজন নিরাপদ বাসস্থান, স্থায়ী বাঁধ, মানসম্মত শিক্ষা, নিয়মিত চিকিৎসাসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। এছাড়া চরাঞ্চলকে আলাদাভাবে ‘উন্নয়ন অঞ্চল’ হিসেবে বিবেচনা করা হলে স্থায়ী পরিবর্তনের পথ আরও সুগম হবে ।
ভোটের সমীকরণে চরাঞ্চলের প্রভাব
গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ), গাইবান্ধা-২ (সদর), গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি–সাঘাটা) আসনের নির্বাচনী ফলাফলে চরাঞ্চলের ভোট উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। এই অঞ্চলের মানুষের ভোটব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করে কোন প্রার্থী চরবাসীর জীবনের বাস্তব সংকটকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, কে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরছেন এবং কে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন তার ওপর।

এই নির্বাচনে কী বদলাবে?
গাইবান্ধার চরবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই— তারা কি আবারও শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ভরসায় থাকবে, না কি এবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সত্যিই নদীসংকুল এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেবেন? গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নয়—নদীশাসন, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে। নির্বাচনের ফলাফল হবে সাময়িক, কিন্তু চরবাসীর জীবনের নিরাপত্তা ও উন্নয়নই হবে এই অঞ্চলের স্থায়ী পরিবর্তনের প্রকৃত সূচনা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 











