রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্রহ্মপুত্র নদের চর : ২৮০ পরিবারের জীবিকায় নতুন যোগ

হলহলিয়া ও ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা একটুকরো চর। বর্ষায় যেখানে ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই, শীতে সেখানে ধূসর বালুর বিস্তার। সেই চরের মাঝখানেই কুড়িগ্রামের রৌমারীর বন্দবেড় ইউনিয়নের বাইশপাড়া গ্রাম। এই প্রত্যন্ত গ্রামে তিন শতাধিক পরিবারের বাস। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ‘নীরব সহাবস্থান’। তবে কাছে গেলেই চোখে পড়ে অন্য এক ছবি।

একসময় নদীতে মাছ ধরা, কৃষিকাজ ছিল এখানকার মানুষের প্রধান পেশা। কিন্তু বন্যা, খরা আর নদীভাঙনের কাছে বারবার হার মানতে হয়েছে তাদের। এসব মানুষ তখন দিনমজুরি, অন্যের জমিতে কাজ কিংবা শহরমুখী হওয়ার পরিকল্পনা করে। আজ সেই প্রত্যন্ত গ্রামের চরেই শোনা যায় ভাগ্য বদলের গল্প। উন্নত জাতের ফ্রিজিয়ান গাভির কালো-সাদা ছোপে বদলে গেছে বাইশপাড়া গ্রামের প্রায় ২৮০ পরিবারের জীবনগাথা। একসময় যে চর ছিল অনিশ্চয়তার প্রতীক, এখন তা হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার ঠিকানা।

ভোর-বিকেলে বাইশপাড়া
ভোরের আলো ফোটা ও বিকেলের আগেই বাইশপাড়ায় শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। কেউ দুধ দোহন করছেন, কেউ দুধ মাপছেন। কেউ আবার খাতায় লিখছেন হিসাব। দোহন করা দুধ বড় বড় হাঁড়ি, বালতিতে করে হেঁটে বিক্রি করার জন্য নিয়ে যান রৌমারী সদর হাটবাজারে। কেউ কেউ বিক্রি করেন স্থানীয় বাজারে। খামারিরা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার পর বাকি দুধ দিচ্ছেন দুগ্ধ সংগ্রহ কেন্দ্রে (চিলিং প্লান্ট)।

পতিত চর থেকে উৎপাদনের মাঠ
চরের খোলা মাঠের প্রাকৃতিক ঘাস আর অনুকূল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে উন্নত জাতের গাভি পালনে ঝুঁকছেন চরবাসী। কম খরচে লালনপালন, স্থানীয় চাহিদা সব মিলিয়ে গাভি পালন হয়ে উঠেছে চরবাসীর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পেশা। একটি গরু দিয়ে শুরু করা অনেকেই আজ গড়ে তুলেছেন ছোটখাটো খামার।

বাইশপাড়া গ্রামের খামারি ফিরোজা বলেন, ২০০৭ সালে ১২ হাজার টাকায় একটি দেশি গাভি কিনে পালন শুরু করছিলাম। ২০১৪ সালে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ১৪ হাজার টাকা দেয় এক এনজিও। বাড়িতে থাকা দেশি গরুটি বিক্রি, এনজিওর সে টাকা এবং বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নেওয়া টাকা এক করে উন্নত জাতের ফ্রিজিয়ান গাভি কিনেছি ৬১ হাজার টাকায়। ওই গাভির একটি বাছুর ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করি। এভাবেই এগিয়ে এখন আমার খামারে রয়েছে ১৭টি গাভি। প্রতিদিন দুধ পাচ্ছি ৭০-৮০ লিটার। আমাকে দেখে গ্রামের অনেকে বাড়িতে গাভি পালন শুরু করেছেন।
গরু পালনের জন্য ২০২১ সালে পড়ালেখা বাদ দিয়ে নিজ বাড়িতে ছুটে আসেন খামারি ফিরোজার সন্তান ফিরোজ মিয়া। তিনি বলেন, প্রতিবছর আয় হয় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। কিছুদিন আগে দুটি গরু বিক্রি করেছি চার লাখ টাকায়। প্রতিবছর যে বাচ্চাগুলো হয় সেগুলো বিক্রি করে জমি রাখি ও সংসারের কাজ করি। দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লিটার দুধ পাই। সেই বিক্রির টাকায় আমার পরিবার ও গরুর সব খরচ চলে যায়।

ঝুঁকি থেকে সম্ভাবনার পথে
শুরুর দিকে সবকিছু এত সহজ ছিল না। চরের কাঁচা সড়ক, চিকিৎসার অভাব, খাবারের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, এই উন্নত জাতের গাভি কি চরের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারবে? তবে সাহস হারাননি তারা। নিজেদের জমানো টাকা, কখনও ঋণ নিয়ে কিনেছেন উন্নত জাতের গাভি। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিসের পরামর্শে গড়েছেন গোয়ালঘর, শিখেছেন খাবারের সুষম মিশ্রণ আর রোগ-বালাইয়ের প্রাথমিক চিকিৎসা। যেখানে দেশি গাভি দিনে দুই-তিন লিটারের বেশি দুধ দিত না, সেখানে ফ্রিজিয়ান গাভি দিচ্ছে ৮ থেকে ১২ লিটার পর্যন্ত দুধ। কারও কারও খামারে দুধের পরিমাণ আরও বেশি।

বদলে যাওয়া সংসার-সমাজ
উন্নত জাতের গাভি শুধু আয় বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে গ্রামের সামাজিক চিত্রও। এক সময় যেখানে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, সেখানে এখন অনেকের পাকা ঘরে টিনের ছাউনি; সন্তানের পড়াশোনার খরচের নিশ্চয়তা। কেউ কিনেছেন মোটরসাইকেল, কেউ আবার স্বপ্ন দেখছেন পাকা ঘরের।

নারীরাও এই পরিবর্তনের বড় অংশীদার। অনেক পরিবারে গাভির দেখভাল, দুধ দোহন আর দই-ঘি তৈরির দায়িত্ব নারীর হাতে। ফলে আয় বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে তাদের আত্মবিশ্বাস আর পারিবারিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ। গ্রামের নারীরা এখন শুধু গৃহকর্মে সীমাবদ্ধ নন; তারা খামারের ব্যবস্থাপকও।

বাইশপাড়া গ্রামের খামারি লাভলী খাতুন বলেন, ‘সাত বছর আগে প্রথমে আমরা দেশি গরু পালতাম। পরে ৫০ হাজার টাকায় একটি ফ্রিজিয়ান গাভি কিনি। তখন দুধ হয়েছিল তিন কেজি করে। ফ্রিজিয়ান গাভি বাচ্চা দেয় বছর বছর। আবার দুধ বিক্রি করে টাকা হয়। এভাবে চলতে চলতে এখন গরু হয়েছে ৯টি। এর মধ্যে গাভি চারটি ও বাছুর পাঁচটি। প্রতিদিন গরুর দুধ পাই ৫০ কেজি।’
খামারি রাশেদা খাতুন বলেন, ‘প্রথমে আমার একটি দেশি গরু আছাল। হেইডা আমি বিক্রি কইরা দুই লাখ টাকা দিয়া একটা গাই কিনছিলাম। কিছু টাকা আমার আছাল, আর কিছু হাওলাত কইরা কিনছি। হেই গাই পানাইছি, দুধ বিক্রি করছি, সংসার চালাচ্ছি। এখন সাতটি গরু। প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ কেজি দুধ পাচ্ছি।’

উদ্যোগের গল্প
খামারিরা বলছেন, সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি শেখার আগ্রহ। নিয়মিত টিকা, পরিচ্ছন্ন গোয়ালঘর, সঠিক খাবার ব্যবস্থাপনা এখন তাদের নিত্যদিনের চর্চা। কেউ কেউ অন্যের দেখে শিখছেন; কেউ আবার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নিচ্ছেন।

গ্রামে ছয়টি গরু পালন করেন খামারি গোলাম হোসেন। তিনি বলেন, আগে আমরা নদীর দিকে তাকিয়ে ভয় পেতাম। এখন গাভির দিকে তাকিয়ে সাহস পাই। একটা ফ্রিজিয়ান গাভি মানে একটা পরিবারের মাসের খরচের নিশ্চয়তা।

এখনও রয়েছে চ্যালেঞ্জ
সব সাফল্যের মাঝেও চ্যালেঞ্জ একেবারে নেই, তা নয়। নদীভাঙনের শঙ্কা এখনও বাইশপাড়া গ্রামের মানুষের পিছু ছাড়ে না। বর্ষায় যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। খাবারের দাম বাড়লে খরচের চাপও বাড়ে। গাভি অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তবু বাইশপাড়া গ্রামের এসব মানুষ হাল ছাড়তে শেখেনি। কারণ তারা জানে, এই গাভির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তাদের ভবিষ্যৎ।

সম্ভাবনার চর
ব্রহ্মপুত্র ও হলহলিয়া নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বাইশপাড়া গ্রাম এখন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মাঝেও কীভাবে পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর সাহস দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, তার প্রমাণ এই বাইশপাড়ার চর। ফ্রিজিয়ান জাতের গাভির কালো-সাদা ছোপে এখন শুধু গোয়ালঘর নয়, রঙিন হয়ে উঠেছে গ্রামের জীবন। নদীর স্রোত যেমন থেমে থাকে না, তেমনি থেমে নেই বাইশপাড়া গ্রামের মানুষের স্বপ্ন।

রৌমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কামরুজ্জামান পাইকার বলেন, বাইশপাড়া গ্রামে এলডিডিপির আওতায় আমাদের একটি পিজি গ্রুপ রয়েছে। সরকারিভাবে তাদের অনেক সহায়তা দিয়েছি। এর মধ্যে ঘাস কাটার জন্য যন্ত্র, দুধ উৎপাদন, ফিড, কৃমিনাশক ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে থাকি।

তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাইশপাড়া সারাদেশের মধ্যে উজ্জ্বল একটি এলাকা। এখানে তিন শতাধিক ডেইরি খামার রয়েছে। প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হচ্ছে। এ দুধ রৌমারীবাসীর চাহিদা পূরণ করে জামালপুর, শেরপুর পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। এলডিডিপির আওতায় একটি স্মল মিল্ক চিলিং সেন্টার চালু করা হয়েছে।

গাইবান্ধার পাঁচ আসনে ক্ষমতার দৌড়ে এগিয়ে বিএনপি ও জামায়াত, নির্লিপ্ত জাতীয় পার্টি 

ব্রহ্মপুত্র নদের চর : ২৮০ পরিবারের জীবিকায় নতুন যোগ

প্রকাশের সময়: ০৫:১২:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬

হলহলিয়া ও ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা একটুকরো চর। বর্ষায় যেখানে ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই, শীতে সেখানে ধূসর বালুর বিস্তার। সেই চরের মাঝখানেই কুড়িগ্রামের রৌমারীর বন্দবেড় ইউনিয়নের বাইশপাড়া গ্রাম। এই প্রত্যন্ত গ্রামে তিন শতাধিক পরিবারের বাস। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ‘নীরব সহাবস্থান’। তবে কাছে গেলেই চোখে পড়ে অন্য এক ছবি।

একসময় নদীতে মাছ ধরা, কৃষিকাজ ছিল এখানকার মানুষের প্রধান পেশা। কিন্তু বন্যা, খরা আর নদীভাঙনের কাছে বারবার হার মানতে হয়েছে তাদের। এসব মানুষ তখন দিনমজুরি, অন্যের জমিতে কাজ কিংবা শহরমুখী হওয়ার পরিকল্পনা করে। আজ সেই প্রত্যন্ত গ্রামের চরেই শোনা যায় ভাগ্য বদলের গল্প। উন্নত জাতের ফ্রিজিয়ান গাভির কালো-সাদা ছোপে বদলে গেছে বাইশপাড়া গ্রামের প্রায় ২৮০ পরিবারের জীবনগাথা। একসময় যে চর ছিল অনিশ্চয়তার প্রতীক, এখন তা হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার ঠিকানা।

ভোর-বিকেলে বাইশপাড়া
ভোরের আলো ফোটা ও বিকেলের আগেই বাইশপাড়ায় শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। কেউ দুধ দোহন করছেন, কেউ দুধ মাপছেন। কেউ আবার খাতায় লিখছেন হিসাব। দোহন করা দুধ বড় বড় হাঁড়ি, বালতিতে করে হেঁটে বিক্রি করার জন্য নিয়ে যান রৌমারী সদর হাটবাজারে। কেউ কেউ বিক্রি করেন স্থানীয় বাজারে। খামারিরা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার পর বাকি দুধ দিচ্ছেন দুগ্ধ সংগ্রহ কেন্দ্রে (চিলিং প্লান্ট)।

পতিত চর থেকে উৎপাদনের মাঠ
চরের খোলা মাঠের প্রাকৃতিক ঘাস আর অনুকূল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে উন্নত জাতের গাভি পালনে ঝুঁকছেন চরবাসী। কম খরচে লালনপালন, স্থানীয় চাহিদা সব মিলিয়ে গাভি পালন হয়ে উঠেছে চরবাসীর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পেশা। একটি গরু দিয়ে শুরু করা অনেকেই আজ গড়ে তুলেছেন ছোটখাটো খামার।

বাইশপাড়া গ্রামের খামারি ফিরোজা বলেন, ২০০৭ সালে ১২ হাজার টাকায় একটি দেশি গাভি কিনে পালন শুরু করছিলাম। ২০১৪ সালে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ১৪ হাজার টাকা দেয় এক এনজিও। বাড়িতে থাকা দেশি গরুটি বিক্রি, এনজিওর সে টাকা এবং বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নেওয়া টাকা এক করে উন্নত জাতের ফ্রিজিয়ান গাভি কিনেছি ৬১ হাজার টাকায়। ওই গাভির একটি বাছুর ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করি। এভাবেই এগিয়ে এখন আমার খামারে রয়েছে ১৭টি গাভি। প্রতিদিন দুধ পাচ্ছি ৭০-৮০ লিটার। আমাকে দেখে গ্রামের অনেকে বাড়িতে গাভি পালন শুরু করেছেন।
গরু পালনের জন্য ২০২১ সালে পড়ালেখা বাদ দিয়ে নিজ বাড়িতে ছুটে আসেন খামারি ফিরোজার সন্তান ফিরোজ মিয়া। তিনি বলেন, প্রতিবছর আয় হয় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। কিছুদিন আগে দুটি গরু বিক্রি করেছি চার লাখ টাকায়। প্রতিবছর যে বাচ্চাগুলো হয় সেগুলো বিক্রি করে জমি রাখি ও সংসারের কাজ করি। দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লিটার দুধ পাই। সেই বিক্রির টাকায় আমার পরিবার ও গরুর সব খরচ চলে যায়।

ঝুঁকি থেকে সম্ভাবনার পথে
শুরুর দিকে সবকিছু এত সহজ ছিল না। চরের কাঁচা সড়ক, চিকিৎসার অভাব, খাবারের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, এই উন্নত জাতের গাভি কি চরের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারবে? তবে সাহস হারাননি তারা। নিজেদের জমানো টাকা, কখনও ঋণ নিয়ে কিনেছেন উন্নত জাতের গাভি। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিসের পরামর্শে গড়েছেন গোয়ালঘর, শিখেছেন খাবারের সুষম মিশ্রণ আর রোগ-বালাইয়ের প্রাথমিক চিকিৎসা। যেখানে দেশি গাভি দিনে দুই-তিন লিটারের বেশি দুধ দিত না, সেখানে ফ্রিজিয়ান গাভি দিচ্ছে ৮ থেকে ১২ লিটার পর্যন্ত দুধ। কারও কারও খামারে দুধের পরিমাণ আরও বেশি।

বদলে যাওয়া সংসার-সমাজ
উন্নত জাতের গাভি শুধু আয় বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে গ্রামের সামাজিক চিত্রও। এক সময় যেখানে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, সেখানে এখন অনেকের পাকা ঘরে টিনের ছাউনি; সন্তানের পড়াশোনার খরচের নিশ্চয়তা। কেউ কিনেছেন মোটরসাইকেল, কেউ আবার স্বপ্ন দেখছেন পাকা ঘরের।

নারীরাও এই পরিবর্তনের বড় অংশীদার। অনেক পরিবারে গাভির দেখভাল, দুধ দোহন আর দই-ঘি তৈরির দায়িত্ব নারীর হাতে। ফলে আয় বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে তাদের আত্মবিশ্বাস আর পারিবারিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ। গ্রামের নারীরা এখন শুধু গৃহকর্মে সীমাবদ্ধ নন; তারা খামারের ব্যবস্থাপকও।

বাইশপাড়া গ্রামের খামারি লাভলী খাতুন বলেন, ‘সাত বছর আগে প্রথমে আমরা দেশি গরু পালতাম। পরে ৫০ হাজার টাকায় একটি ফ্রিজিয়ান গাভি কিনি। তখন দুধ হয়েছিল তিন কেজি করে। ফ্রিজিয়ান গাভি বাচ্চা দেয় বছর বছর। আবার দুধ বিক্রি করে টাকা হয়। এভাবে চলতে চলতে এখন গরু হয়েছে ৯টি। এর মধ্যে গাভি চারটি ও বাছুর পাঁচটি। প্রতিদিন গরুর দুধ পাই ৫০ কেজি।’
খামারি রাশেদা খাতুন বলেন, ‘প্রথমে আমার একটি দেশি গরু আছাল। হেইডা আমি বিক্রি কইরা দুই লাখ টাকা দিয়া একটা গাই কিনছিলাম। কিছু টাকা আমার আছাল, আর কিছু হাওলাত কইরা কিনছি। হেই গাই পানাইছি, দুধ বিক্রি করছি, সংসার চালাচ্ছি। এখন সাতটি গরু। প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ কেজি দুধ পাচ্ছি।’

উদ্যোগের গল্প
খামারিরা বলছেন, সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি শেখার আগ্রহ। নিয়মিত টিকা, পরিচ্ছন্ন গোয়ালঘর, সঠিক খাবার ব্যবস্থাপনা এখন তাদের নিত্যদিনের চর্চা। কেউ কেউ অন্যের দেখে শিখছেন; কেউ আবার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নিচ্ছেন।

গ্রামে ছয়টি গরু পালন করেন খামারি গোলাম হোসেন। তিনি বলেন, আগে আমরা নদীর দিকে তাকিয়ে ভয় পেতাম। এখন গাভির দিকে তাকিয়ে সাহস পাই। একটা ফ্রিজিয়ান গাভি মানে একটা পরিবারের মাসের খরচের নিশ্চয়তা।

এখনও রয়েছে চ্যালেঞ্জ
সব সাফল্যের মাঝেও চ্যালেঞ্জ একেবারে নেই, তা নয়। নদীভাঙনের শঙ্কা এখনও বাইশপাড়া গ্রামের মানুষের পিছু ছাড়ে না। বর্ষায় যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। খাবারের দাম বাড়লে খরচের চাপও বাড়ে। গাভি অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তবু বাইশপাড়া গ্রামের এসব মানুষ হাল ছাড়তে শেখেনি। কারণ তারা জানে, এই গাভির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তাদের ভবিষ্যৎ।

সম্ভাবনার চর
ব্রহ্মপুত্র ও হলহলিয়া নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বাইশপাড়া গ্রাম এখন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মাঝেও কীভাবে পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর সাহস দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, তার প্রমাণ এই বাইশপাড়ার চর। ফ্রিজিয়ান জাতের গাভির কালো-সাদা ছোপে এখন শুধু গোয়ালঘর নয়, রঙিন হয়ে উঠেছে গ্রামের জীবন। নদীর স্রোত যেমন থেমে থাকে না, তেমনি থেমে নেই বাইশপাড়া গ্রামের মানুষের স্বপ্ন।

রৌমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কামরুজ্জামান পাইকার বলেন, বাইশপাড়া গ্রামে এলডিডিপির আওতায় আমাদের একটি পিজি গ্রুপ রয়েছে। সরকারিভাবে তাদের অনেক সহায়তা দিয়েছি। এর মধ্যে ঘাস কাটার জন্য যন্ত্র, দুধ উৎপাদন, ফিড, কৃমিনাশক ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে থাকি।

তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাইশপাড়া সারাদেশের মধ্যে উজ্জ্বল একটি এলাকা। এখানে তিন শতাধিক ডেইরি খামার রয়েছে। প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হচ্ছে। এ দুধ রৌমারীবাসীর চাহিদা পূরণ করে জামালপুর, শেরপুর পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। এলডিডিপির আওতায় একটি স্মল মিল্ক চিলিং সেন্টার চালু করা হয়েছে।