
তাসলিমুল হাসান সিয়াম: হাতে গোনা দুই–চারটি ব্যতিক্রম ছাড়া মফস্বলে কর্মরত অধিকাংশ গণমাধ্যমকর্মী আজও সম্মানজনক বেতন কিংবা নিয়মিত সম্মানী ভাতা থেকে বঞ্চিত। সাংবাদিকতা—যে পেশা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত—সেই পেশাটিই এখন অনেক ক্ষেত্রে টিকে থাকার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সরকারই গণমাধ্যমকে একটি সুসংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি।
বাংলাদেশে বর্তমানে পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল মিলিয়ে প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি সংবাদমাধ্যম সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব থেকে ধারণা পাওয়া যায়। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত—দুই ধরনের মাধ্যমই এতে অন্তর্ভুক্ত। মাত্র ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৬১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি দেশে এতো বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যম শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, পুরো বিশ্বেই বিরল। প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যম কি বাস্তবিক অর্থে জনগণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করছে, নাকি এটি একটি অনিয়ন্ত্রিত ও অসুস্থ ব্যবস্থার প্রতিফলন?
গণমাধ্যমের এই দুরাবস্থার পেছনে সবচেয়ে বড় দায় দেশের অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা বড় কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে একের পর এক মিডিয়া হাউজ প্রতিষ্ঠা করছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই মূল উদ্দেশ্য সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং প্রভাব বিস্তার, দরকষাকষি কিংবা প্রতিপক্ষ দমন।
এর ফল ভোগ করছেন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা। অধিকাংশ মিডিয়া হাউজে শ্রম আইন, ওয়েজবোর্ড কিংবা পেশাগত নীতিমালার কোনো তোয়াক্কা করা হয় না। নিয়মিত বেতন না পাওয়া, চুক্তিভিত্তিক অনিশ্চিত কাজ, এমনকি সংবাদ সংগ্রহের খরচও নিজের পকেট থেকে বহন করতে বাধ্য হওয়া—এসব এখন মফস্বল সাংবাদিকতার নিত্যদিনের বাস্তবতা। সরকারি তদারকি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ না থাকায় মালিকপক্ষ নির্বিঘ্নে এসব অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অতিরিক্ত গণমাধ্যমের এই অপ্রয়োজনীয় বিস্তার সংবাদমানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রতিযোগিতার নামে চলছে চাটুকারিতা, গুজব, আধা-সত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ পরিবেশন। এতে একদিকে যেমন সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও বিভ্রান্ত হচ্ছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু স্বাধীনতার অর্থ নিয়ন্ত্রণহীনতা নয়। একটি সুস্থ গণমাধ্যম ব্যবস্থার জন্য লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া, ন্যূনতম মূলধন, কর্মীদের ন্যায্য মজুরি এবং ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন—এসব বিষয় নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত মালিকানা কাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি।
গণমাধ্যমের সংখ্যা নয়, প্রয়োজন গুণগত মান ও পেশাদারিত্ব। নচেৎ এই অতিরিক্ত বিস্তার শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে তাকে আরও দুর্বলই করবে। সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় এখনই সময়—রাষ্ট্র, সমাজ ও সাংবাদিক সমাজকে একসঙ্গে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
নিজস্ব প্রতিবেদক 















