মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু অন্ধকার রাত আছে যেগুলো সময়ের ধারায় হারিয়ে যায় না, বরং চিরকাল একটি জাতির চেতনায় জেগে থাকে ক্ষত হয়ে, প্রশ্ন হয়ে এবং পরিশেষে দায় হয়ে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঠিক তেমনই একটি কালরাত যেখানে অন্ধকার শুধু রাতের আকাশে নয়, রাতটা নেমে এসেছিল মানুষের বিবেকেও।
ঢাকা শহর যখন ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক তখন হঠাৎ খুলে গেল নরকের দরজা। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এক নির্মম পরিকল্পনায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনী যে বর্বরতা চালাল তা শুধু একটি সামরিক অভিযান ছিল না,সেটি ছিল একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার জঘন্য প্রচেষ্টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, পুলিশ আর সাধারণ মানুষের বুদ্ধিজীবী ও জ্ঞানীদের কেহই রক্ষা পায়নি সেই উন্মত্ত হত্যাযজ্ঞ থেকে।
রক্তাক্ত সেই দিনটি আজ গণহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হয় তবে ৫৫ বছর পেরিয়েও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়া আমাদের জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি বিশ্ববিবেকের এক গভীর নীরবতার প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস বলে যেখানে অন্যায় ঘটে, সেখানে নীরবতা কখনো নিরপেক্ষতার ভনিতা হতে পারে না বরং অন্যায়ের এক নীরব সমর্থন হয়ে দাঁড়ায় ।
২৫ মার্চ শুধু আমাদের শোকের দিন নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের দিন। এই দিনটি মনে করিয়ে দেয় আমাদের স্বাধীনতা কোনো উপহার হয়ে আসেনি ,এটি অর্জিত হয়েছে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে।যে রক্তের ঋণ আমাদের শুধু স্মরণে নয়, কর্মে পরিশোধ করতে হবে।
আজকের প্রজন্মের জন্য এই দিনটির তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের অনুভূতি ম্লান হয়ে যেতে পারে কিন্তু সত্য কখনো ম্লান হয় না। প্রত্যেক তরুণ- তরুণীকে জানতে হবে কীভাবে একটি জাতি অন্ধকার থেকে আলোয় উঠে এসেছে, কীভাবে ভয়াল এক রাত থেকেই জন্ম নিয়েছে মুক্তির সূর্য।
একইসঙ্গে আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও রয়ে যায় এই বলে আমরা কি সেই চেতনা ধারণ করতে পেরেছি? যে চেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের কথা বলে? যদি না পারি, তবে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের প্রশ্নটি কেবল কূটনৈতিক নয়; এটি একটি নৈতিক দাবিও। ১৯৭১ সালের গণহত্যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যে স্বীকৃতি পাওয়া মানে শুধু অতীতের বিচার নয়, ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা প্রতিষ্ঠা করা। যাতে পৃথিবীর কোথাও আর কোনো জাতি এমন নির্মমতার শিকার না হয়।
২৫ মার্চের কালরাত্রি আমাদের শিখিয়েছে যে অন্ধকার যত গভীরই হোক, প্রতিরোধের আগুন নিভে যায় না। যে আগুন বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, সাহসী করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথকে এগিয়ে নিয়েছিল।
আজ যখন আমরা এক মিনিটের জন্য আলো নিভিয়ে সেই রাতকে স্মরণ করি, তখন আমাদের উচিত নিজের ভেতরের আলো জ্বালানো যে সচেতনতার, ন্যায়বোধের আর মানবতার ।
কারণ ইতিহাস শুধু অতীত নয় যা বর্তমানের দায় এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা।
২৫ মার্চ তাই শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়; এটি একটি অঙ্গীকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর,
সত্যকে উচ্চারণ করার এবং মানবতার পক্ষে ইতিহাসকে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার।
এই অঙ্গীকারই হোক আমাদের সম্মিলিত চেতনার ভিত্তি ।
প্রকাশক ও সম্পাদক: বিমল কুমার সরকার নির্বাহী সম্পাদক: তাসলিমুল হাসান সিয়াম বার্তা সম্পাদক: শামসুর রহমান হৃদয়। সম্পাদকীয় কার্যালয়: তুলশীঘাট (সাদুল্লাপুর রোড), গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা-৫৭০০
© All Rights Reserved © Kaler Chithi