তাসলিমুল হাসান সিয়াম: গাইবান্ধা জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ২১ লাখ ৯০ হাজার ৪০১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১০ লাখ ৮২ হাজার ৪৩৭ জন এবং নারী ১১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন। অর্থাৎ পুরুষের চেয়ে অন্তত ২৫ হাজার বেশি নারী ভোটার রয়েছে। এই সংখ্যাগত ব্যবধানই গাইবান্ধার নির্বাচনী মাঠে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। প্রার্থীরা বলছেন—“গাইবান্ধার ভোটের ফলাফল নির্ধারণে যে ফ্যাক্টরটি এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, তা হলো নারী ভোট।”
এই সংখ্যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক পরিবর্তন। গাইবান্ধার গ্রাম-গঞ্জে এখন নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার বেশ কিছু সরকারি- বেসরকারি প্রকল্প তাদের জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলেছে। ফলে নারীরা এখন শুধু ভোটার নন তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন একটি শক্তিশালী অংশ। সামাজিকভাবে এখনও তারা কিছুটা সংযত থাকলেও ভোটের বিষয়ে মতামত গঠনে পুরুষের ওপর নির্ভরতা কমেছে। পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের প্রভাব আগের তুলনায় বেশি। স্থানীয় নারীরা বলছেন, “ভাতা পাই, ছেলে-মেয়েদের স্কুলের সুবিধা পাই, হাসপাতালে গেলে সেবা পাই—এসবই আমাদের জীবনের অংশ। তাই আমরা দেখি কারা আসলে কাজ করেছে।”
গাইবান্ধা সরকারি কলেজের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অর্থী মনি জানান, এটি আমার জীবনের প্রথম ভোট। শান্তি পূর্ণ ভাবে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারব এমনটাই প্রত্যাশা রাখি । আমরা চাই কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।
ফুলছড়ি উপজেলার চর মানিককরের গৃহিণী শিউলি খাতুন বলেন “চরে রোগ হলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া বড় কষ্টের। প্রসূতি সেবা তো আরও দূরের কথা। আমরা চাই হাসপাতালের নৌকা সেবা কিংবা কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্র।”
পলাশবাড়ী উপজেলার দর্জি মমতাজ বানু, “আমাদের মতো নারীদের ছোট ব্যবসার সুযোগ দিলে পরিবারও দাঁড়াবে, আমরাও এগোবো। ভোট দিবো তাকে যে মহিলা উদ্যোক্তাদের সুযোগ বাড়াবে।”
গাইবান্ধা পৌর শহরের বেসরকারি চাকরিজীবি শর্মিলা আক্তার, বলেন “শহরে সবচেয়ে বড় সমস্যা নিরাপত্তা। অফিস থেকে রাতে ফিরলে ভয় লাগে। ফুটপাথ, রাস্তার আলো, সিসিটিভি—এইগুলো জরুরি। যে প্রার্থী এগুলো করবে, আমরা তাঁকে গুরুত্ব দেব।”
প্রার্থীরাও বুঝতে পারছেন এই জেলায় নারী ভোটারদের আস্থা অর্জন ছাড়া জয়ের পথ অনেক কঠিন। তাই প্রচারণার ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে যেখানে গণসংযোগ মানেই ছিল পুরুষ ভোটারদের কেন্দ্র করে প্রচারণা, এখন সেখানে প্রতিটি দলই নারী-কেন্দ্রিক কর্মসূচি চালাচ্ছে।
এদিকে নিজ দলের প্রার্থীদের জয়ী করতে মাঠে নেমেছে নারী কর্মী সমর্থকরা । তারা উঠান বৈঠকের মাধ্যমে নারীদের স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণ, প্রসূতি সেবা, নারীদের উদ্যোক্তা সহায়তা—এসব প্রতিশ্রুতি সামনে রেখে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গাইবান্ধা -২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী আনিসুজ্জামান বাবুর নির্বাচনী প্রচারণা দলের সদস্য লাভলী বেগম বলেন, “নারী ভোটারদের কাছে না গেলে নির্বাচন জেতা অসম্ভব। তারা এখন খুব হিসাব করে ভোট দেন।”
এদিকে জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য বলছে গাইবান্ধার সদর, গোবিন্দগঞ্জ ও সুন্দরগঞ্জে নারী ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ফলে নারী ভোটের সামান্য দোলাচলেও বিজয় বা পরাজয়ের ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
গাইবান্ধার রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নারীরা কেবল সংখ্যায় বেশি নন, তাদের ভোট দেওয়ার ধরণেও এসেছে পরিবর্তন। তারা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি মুখে শুনে ভোট দেন না; সাম্প্রতিক বছরে জীবনে বাস্তব সুবিধা কী পেয়েছেন, সেই হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নেন। তাই প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, দলীয় শক্তি কিংবা প্রচারণার জৌলুশ—এসবকিছুর চেয়ে তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তব কাজ।
প্রকাশক ও সম্পাদক: বিমল কুমার সরকার নির্বাহী সম্পাদক: তাসলিমুল হাসান সিয়াম বার্তা সম্পাদক: শামসুর রহমান হৃদয়। সম্পাদকীয় কার্যালয়: তুলশীঘাট (সাদুল্লাপুর রোড), গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা-৫৭০০
© All Rights Reserved © Kaler Chithi