বিমল সরকার : রাষ্ট্রের রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয় । এটি এটি ভাষার নৈতিকতা, দৃষ্টিভঙ্গির শুদ্ধতা এবং নাগরিক মর্যাদার পরীক্ষাও বটে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে এমন এক প্রবণতা জ্বলন্ত দৃশ্যমান যেখানে নারীর পরিচয়, ইমেজ কিংবা সিদ্ধান্তকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক বয়ানের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রবণতা কোনো একটি দলের প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির আত্মসমালোচনার দাবি তোলে। গণতন্ত্রে মতভিন্নতা স্বাভাবিক। যেখানে ভিন্ন সিদ্ধান্ত, কিংবা ভিন্ন অবস্থান নাগরিক সমাজেরই স্বকীয় সত্বা । কিন্তু সেই ভিন্নতাকে যখন নারীর ব্যক্তিগত মর্যাদা, চরিত্র বা পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, তখন রাজনীতি তার নৈতিক সীমা অতিক্রম করে। তখন প্রশ্ন ওঠে এভাবে যে আমরা কি মত প্রকাশ করছি, নাকি প্রপাগান্ডার ভাষায় নাগরিকদের একটি গোষ্ঠীকে সংকুচিত করছি? নারী সমাজ কোনো একক রাজনৈতিক সত্তা নন, যাঁদের সিদ্ধান্ত একটি স্লোগানে ব্যাখ্যা করা যায়। নারী ভোটাররা তথ্য বিবেচনা করেন, অভিজ্ঞতা থেকে শেখেন, বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের পছন্দ-অপছন্দকে যদি সরলীকরণ করা হয়, তবে তা কেবল ভুল ব্যাখ্যা নয় ,তা হবে নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার অবমূল্যায়ন। এখানে একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করা জরুরী যে নারী কেবল ভোটার নন। নারী কেবল রাজনৈতিক সংখ্যা নন। নারী প্রতিটি পুরুষের জননী। যে রাজনীতি নারীর সিদ্ধান্তকে অবমাননার ভাষায় ব্যাখ্যা করে, সে রাজনীতি নিজের শিকড়কেই অস্বীকার করে। কারণ নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়। গণতন্ত্র তখন কাগুজে হয়ে পড়ে ,ভাষার মাধুর্য থাকলেও মূল্যবোধ থাকে না। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্র মানে প্রশ্ন করার অধিকার, ভিন্নমতকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং নাগরিকের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা। নারীর ভোটকে যদি ভুলভাবে চিহ্নিত করা হয়, তবে সেটি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, তা হবে ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এক বিপজ্জনক নজির। দৈনিক কালের চিঠি মনে করে যে রাজনীতির উন্নতি ঘটাতে হলে ভাষাকে শুদ্ধ হতে হবে।ভিন্নমতকে শত্রু নয়, সংলাপের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। ব্যক্তিগত ইমেজকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো থেকে সরে আসতে হবে।আর সর্বোপরি নারীর স্বাধীন ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তকে পূর্ণ মর্যাদা দিতে হবে। কারণ রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় অস্ত্র দিয়ে নয়, নৈতিকতা দিয়ে।আর নৈতিকতা টিকে থাকে তখনই, যখন নারীর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।
প্রকাশক ও সম্পাদক: বিমল কুমার সরকার নির্বাহী সম্পাদক: তাসলিমুল হাসান সিয়াম বার্তা সম্পাদক: শামসুর রহমান হৃদয়। সম্পাদকীয় কার্যালয়: তুলশীঘাট (সাদুল্লাপুর রোড), গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা-৫৭০০
© All Rights Reserved © Kaler Chithi