
তাসলিমুল হাসান সিয়াম: গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ—এই কথাটি বহুল প্রচলিত। সমাজে ঘটে যাওয়া ঘটনা, অন্যায়-অবিচার, অপরাধ ও মানবিক বিপর্যয় জনসমক্ষে তুলে ধরার গুরুদায়িত্ব গণমাধ্যমের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের মফস্বল পর্যায়ে কর্মরত অনেক সাংবাদিক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নৈতিক নির্দেশনার অভাবে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে প্রায়ই উদাসীন আচরণ করেন। এর ফলস্বরূপ ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন কিংবা সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর ঘটনার শিকার নারীর ছবি, নাম, ঠিকানা ও পরিচয় প্রকাশিত হয়, যা শুধু অনৈতিকই নয়, আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী যৌন সহিংসতা বা নির্যাতনের শিকার নারীর পরিচয় প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনসহ বিভিন্ন আইনে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও মফস্বলের কিছু গণমাধ্যমে দেখা যায়—সংবাদের চটকদারতা বাড়াতে কিংবা পাঠক-দর্শক আকর্ষণের আশায় ভুক্তভোগী নারীর মুখচ্ছবি, পারিবারিক পরিচয় এমনকি ব্যক্তিগত তথ্যও প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন আইনের লঙ্ঘন ঘটছে, অন্যদিকে ভুক্তভোগী নারী সামাজিকভাবে আরও হেনস্থার শিকার হচ্ছেন।
এই ধরনের সংবাদ পরিবেশনের ফলে ভুক্তভোগীর মানসিক আঘাত বহুগুণ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের চাপে নারী ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ থেকেও সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। ধর্ষণ বা নির্যাতনের মতো ঘটনার ক্ষেত্রে পরিচয় প্রকাশ হলে ভুক্তভোগী আজীবন সামাজিক লাঞ্ছনা, অপমান ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং অপরাধীরা পরোক্ষভাবে উৎসাহিত হয়।
এই সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হলো মফস্বলের সাংবাদিকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব। অনেক সাংবাদিক পেশাগত নৈতিকতা, মানবাধিকার সাংবাদিকতা কিংবা জেন্ডার সংবেদনশীল প্রতিবেদনের বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতা শিক্ষার বাইরে থেকে কাজ শুরু করেন এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই পেশা রপ্ত করেন। ফলে আইন, নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের ঘাটতি থেকে যায়।
এ অবস্থায় মফস্বলের সাংবাদিকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি। সংবাদ পরিবেশনের সময় নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও মানবিক দিককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ভুক্তভোগী নারীকে কখনোই সংবাদের বিষয়বস্তু নয়, বরং একজন মানবিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ, প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত কর্মশালা, প্রশিক্ষণ ও নীতিমালাভিত্তিক দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা করে সংবাদ পরিবেশন করাই প্রকৃত সাংবাদিকতার পরিচয়। বিশেষ করে মফস্বলের সাংবাদিকদের আইনগত সীমা ও নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না হলে গণমাধ্যম সমাজের উপকারের বদলে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সময়ের দাবিতে নারী সংবেদনশীল ও মানবাধিকারভিত্তিক সাংবাদিকতা চর্চা এখন অপরিহার্য।
প্রকাশক ও সম্পাদক: বিমল কুমার সরকার নির্বাহী সম্পাদক: তাসলিমুল হাসান সিয়াম বার্তা সম্পাদক: শামসুর রহমান হৃদয়। সম্পাদকীয় কার্যালয়: তুলশীঘাট (সাদুল্লাপুর রোড), গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা-৫৭০০
© All Rights Reserved © Kaler Chithi