
তাসলিমুল হাসান সিয়াম : বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নদীবহুল ভূপ্রকৃতি, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা বহুদিন ধরেই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। ভারতের আসাম অঞ্চলের নিকটবর্তী হওয়ায় এ অঞ্চলে কম্পন তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হয়। গাইবান্ধা জেলা সেই ভূকম্পন অঞ্চলের খুব কাছাকাছি হওয়ায় অতীতেও বহু ভূমিকম্পের সাক্ষী। সরকারি নথিতে ১৮৮৫ সালের ভূমিকম্পের উল্লেখ থাকলেও গাইবান্ধার ভূপ্রকৃতিতে সবচেয়ে বড় ও স্থায়ী পরিবর্তন এনে দেয় ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প।
১৮৯৭ সালের ১২ জুন বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট। আচমকা প্রবল ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে বাংলা, বিহার ও আসাম। রিখটার স্কেল আবিষ্কারের আগের সময় হলেও গবেষকেরা ধারণা করেন, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল প্রায় ৮.৭ দক্ষিণ এশিয়ার ভূকম্পন-ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয়।
তৎকালীন রংপুর জেলার অন্তর্গত গাইবান্ধা মহকুমা ছিল এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। এখানে জমির উচ্চতা-নিম্নতার চরম তারতম্য, নদীপথের পরিবর্তন, বিল ভরাট হয়ে আবাদযোগ্য জমিতে রূপ নেওয়া এবং উঁচু ভূমির গভীর খাদে পরিণত হওয়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
এই ভূমিকম্পে গাইবান্ধা জেলায় দেখা দেয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।
ঐতিহাসিক দলিলপত্রে উল্লেখ আছে ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে গাইবান্ধায় কাঁচা-পাকা বহু ঘরবাড়িসহ ধসে পড়ে অসংখ্য শস্যগুদাম । রাস্তাঘাট, পাতকুয়া, সেতু ও রেলপথ ভেঙে যায়। উর্বর কৃষিজমির বড় অংশ বালুচরে পরিণত হয়। নিম্নভূমি উঁচু জমিতে আর উঁচু জমির অনেকখানি অংশ ধসে গভীর খাদে রূপ নেয়। এই পরিবর্তন শুধু ক্ষয়ক্ষতি নয় বরং গাইবান্ধা জেলার ভূ-ইতিহাসেই স্থায়ী পরিবর্তন ডেকে আনে।
নদী-খালের গতিপথে ব্যাপক পরিবর্তন:
ভূমিকম্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহে। এর ফলে নিচু জমির উচ্চতা হঠাৎ বেড়ে যায়,ছোট নদী ও খালের তলদেশ উঁচু হয়ে পড়ে। এছাড়া নৌপথে পানির গতি কমে যায়, কোথাও কোথাও প্রবাহ পুরোপুরি বদলে যায়।
বিশেষত সুন্দরগঞ্জ ও গাইবান্ধা উপজেলায় সারাই ও মানস নদী, পলাশবাড়িতে আখিরা ও নলেয়া খাল এবং জেলার প্রধান ঘাঘট নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় দেখা দেয়, কৃষিতেও পড়ে বড় প্রভাব।
স্থানীয় উপকথা ও ঐতিহাসিক সূত্র বলছে—পীরগঞ্জের বড়বিলা থেকে নলেয়া খালের নতুন গতিপথও নাকি এই ভূমিকম্পেরই ফল।
আজও ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল:
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার ভূকম্পনপ্রবণতার কারণে গাইবান্ধায় এখনও মাঝেমধ্যে হালকা কম্পন অনুভূত হয়। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ১৮৯৭ সালের মতো বড় ভূমিকম্প না ঘটলেও অঞ্চলটি এখনও সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি—তাই দুর্যোগ প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া:
১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প শুধু কয়েক মুহূর্তের কম্পন ছিল না—এটি বদলে দিয়েছিল উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূপ্রকৃতি। গাইবান্ধার নদী, খাল, বিল, কৃষিজমি এবং মানুষের জীবনযাত্রায় যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এনে দিয়েছিল, তার প্রতিচ্ছাপ আজও টের পাওয়া যায়।
প্রকাশক ও সম্পাদক: বিমল কুমার সরকার নির্বাহী সম্পাদক: তাসলিমুল হাসান সিয়াম বার্তা সম্পাদক: শামসুর রহমান হৃদয়। সম্পাদকীয় কার্যালয়: তুলশীঘাট (সাদুল্লাপুর রোড), গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা-৫৭০০
© All Rights Reserved © Kaler Chithi