সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

টংক আন্দোলনের নেত্রী কুমুদিনী হাজং মারা গেছেন

 

 

নেত্রকোণার দুর্গাপুরে ব্রিটিশ বিরোধী টংক আন্দোলন তথা হাজং বিদ্রোহের একমাত্র সংগ্রামী মুখপাত্র কুমুদিনী হাজং আর নেই। শনিবার (২৩ মার্চ) দুপুরে বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ বাড়ি বহেড়াতলীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

মৃত্যুকালে ৩ ছেলে ও ২ মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন এই সংগ্রামী নারী। রোববার (২৪ মার্চ) সকালে স্থানীয় শশ্মানঘাটে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে জানা গেছে।

দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেড়াতলী গ্রামে পাহাড়ী অঞ্চলের এক টিলায় বসবাস করতেন কুমুদিনী। হাজং বিদ্রোহের সাক্ষী কুমুদিনী হাজং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধু, টংক আন্দোলন, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানি জুলুম বৈষম্য, নিপীড়ন, ১৯৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মহান স্বাধীনতা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনের কালের সাক্ষি ছিলেন তিনি।

জানা যায়, টংক আন্দোলনকারীদের খোঁজ করার নামে আন্দোলনকারী কৃষক হাজং নেতা কুমুদিনীর স্বামী লংকেশ্বর হাজংকে ঘরে না পেয়ে ব্রিটিশ পুলিশ নববধু কুমুদিনীকে জোর করে টেনেহিঁছড়ে নিয়ে যাচ্ছিল দুর্গাপুর সেনাছাউনির দিকে। এই খবর পেয়ে বহেড়াতলী গ্রামের রাশিমনি হাজং শতাধিক নারী-পুরুষ নিয়ে দা, ঝাড়ু, বল্লম, লাঠি, তির-ধনুকসহ সুমেশ্বরী নদীর তীরে কুমুদিনীকে ছেড়ে দিতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবে পুলিশ কোন কথাই না শুনে টেনেহিঁছড়ে কুমুদিনীকে দুর্গাপুরের সেনাছাউনির দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে রাশমনি হাজং দা দিয়ে পুলিশদের এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকলে একজন পুলিশ ঘটনাস্থলেই মারা যান। পুলিশের গুলিতে রাশিমনি হাজং নিহত হন।

সহযোদ্ধা সুরেন্দ্র হাজং সেই পুলিশকে কুপিয়ে মেরে ফেলেন। পরবর্তীতে পুলিশের গুলিতে ২২ জন হাজং কৃষক নারী-পুরুষ মারা যায়। পরে পরস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ চলে যায়। গ্রামবাসীদের ওপর আরও হামলা হতে পারে এই ভয়ে মরদেহগুলো সুমেশ্বরী নদীতে ভাসিয়ে দেয়। পরদিন ব্রিটিশ পুলিশ বহেড়াতলী গ্রামে তাণ্ডব চালায় এবং পুরো গ্রামকে তছনছ করে ফেলে। কুমুদিনী হাজংয়ের স্বামী মারা যান ২০০০ সালে।

কুমুদিনী হাজং বেশকিছু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এরমধ্যে, ১৯৯৯ সালে তেভাগা কৃষক আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে পুরস্কার, ২০০৩ সালে অনন্যা শীর্ষ দশ নির্বাচিত পুরস্কার, ২০০৫ সালে স্বদেশ চিন্তা সংঘ ড. আহম্মদ শরীফ স্মারক পুরস্কার, ২০০৭ সালে মনিসিংহ স্মৃতিপদক পুরস্কার, ২০১০ সালে সিধু কানহু ফুলমনি পদক, ২০১৪ সালে জলশিঁড়ি পদক, ২০১৮ সালে হাজং জাতীয় পুরস্কার, ২০২১ সালে নেত্রকোণা জেলা প্রশাসক সম্মাননা, ২০২২ সালে পথ পাঠাগার সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

তার মৃত্যুতে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহী, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রেমন্ড আরেং, সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা দিবালোক সিংহ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিচালক গীতি কবি সুজন হাজংসহ আরও অনেকে শোক প্রকাশ করেছেন।

কালের চিঠি / আলিফ

Tag :

টংক আন্দোলনের নেত্রী কুমুদিনী হাজং মারা গেছেন

Update Time : ০৩:৩৮:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ মার্চ ২০২৪

 

 

নেত্রকোণার দুর্গাপুরে ব্রিটিশ বিরোধী টংক আন্দোলন তথা হাজং বিদ্রোহের একমাত্র সংগ্রামী মুখপাত্র কুমুদিনী হাজং আর নেই। শনিবার (২৩ মার্চ) দুপুরে বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ বাড়ি বহেড়াতলীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

মৃত্যুকালে ৩ ছেলে ও ২ মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন এই সংগ্রামী নারী। রোববার (২৪ মার্চ) সকালে স্থানীয় শশ্মানঘাটে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে জানা গেছে।

দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেড়াতলী গ্রামে পাহাড়ী অঞ্চলের এক টিলায় বসবাস করতেন কুমুদিনী। হাজং বিদ্রোহের সাক্ষী কুমুদিনী হাজং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধু, টংক আন্দোলন, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানি জুলুম বৈষম্য, নিপীড়ন, ১৯৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মহান স্বাধীনতা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনের কালের সাক্ষি ছিলেন তিনি।

জানা যায়, টংক আন্দোলনকারীদের খোঁজ করার নামে আন্দোলনকারী কৃষক হাজং নেতা কুমুদিনীর স্বামী লংকেশ্বর হাজংকে ঘরে না পেয়ে ব্রিটিশ পুলিশ নববধু কুমুদিনীকে জোর করে টেনেহিঁছড়ে নিয়ে যাচ্ছিল দুর্গাপুর সেনাছাউনির দিকে। এই খবর পেয়ে বহেড়াতলী গ্রামের রাশিমনি হাজং শতাধিক নারী-পুরুষ নিয়ে দা, ঝাড়ু, বল্লম, লাঠি, তির-ধনুকসহ সুমেশ্বরী নদীর তীরে কুমুদিনীকে ছেড়ে দিতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবে পুলিশ কোন কথাই না শুনে টেনেহিঁছড়ে কুমুদিনীকে দুর্গাপুরের সেনাছাউনির দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে রাশমনি হাজং দা দিয়ে পুলিশদের এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকলে একজন পুলিশ ঘটনাস্থলেই মারা যান। পুলিশের গুলিতে রাশিমনি হাজং নিহত হন।

সহযোদ্ধা সুরেন্দ্র হাজং সেই পুলিশকে কুপিয়ে মেরে ফেলেন। পরবর্তীতে পুলিশের গুলিতে ২২ জন হাজং কৃষক নারী-পুরুষ মারা যায়। পরে পরস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ চলে যায়। গ্রামবাসীদের ওপর আরও হামলা হতে পারে এই ভয়ে মরদেহগুলো সুমেশ্বরী নদীতে ভাসিয়ে দেয়। পরদিন ব্রিটিশ পুলিশ বহেড়াতলী গ্রামে তাণ্ডব চালায় এবং পুরো গ্রামকে তছনছ করে ফেলে। কুমুদিনী হাজংয়ের স্বামী মারা যান ২০০০ সালে।

কুমুদিনী হাজং বেশকিছু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এরমধ্যে, ১৯৯৯ সালে তেভাগা কৃষক আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে পুরস্কার, ২০০৩ সালে অনন্যা শীর্ষ দশ নির্বাচিত পুরস্কার, ২০০৫ সালে স্বদেশ চিন্তা সংঘ ড. আহম্মদ শরীফ স্মারক পুরস্কার, ২০০৭ সালে মনিসিংহ স্মৃতিপদক পুরস্কার, ২০১০ সালে সিধু কানহু ফুলমনি পদক, ২০১৪ সালে জলশিঁড়ি পদক, ২০১৮ সালে হাজং জাতীয় পুরস্কার, ২০২১ সালে নেত্রকোণা জেলা প্রশাসক সম্মাননা, ২০২২ সালে পথ পাঠাগার সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

তার মৃত্যুতে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহী, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রেমন্ড আরেং, সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা দিবালোক সিংহ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিচালক গীতি কবি সুজন হাজংসহ আরও অনেকে শোক প্রকাশ করেছেন।

কালের চিঠি / আলিফ