মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

গাইবান্ধায় পালানাট্যের অভূতপূর্ব উৎসব

উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় সারথী থিয়েটার নামে এক তারুণ্যদীপ্ত নাট্যদল তাদের দলের ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে পালানাট্য উৎসবের আয়োজন করে। গাইবান্ধাকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার এ দলটির তিনদিনের পালানাট্য উৎসবে উপচেপড়া দর্শক উপস্থিতি জানান দেয়- বাংলাদেশের আবহমান নাট্যধারা ‘পালা’। আজো গ্রামীণ বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় পরিবেশনা ‘পালা’।

 

দর্শকমুখর পরিবেশে গত ১ মার্চ (শুক্রবার) গাইবান্ধা সদরের দারিয়াপুর হাটখোলায় সন্ধ্যা ৭টায় তিনদিন ব্যাপী ‘হাকিম আলী গায়েন পালানাট্য উৎসব’-এর উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। উদ্বোধন করেন লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও লেখক অধ্যাপক মাজহারউল মান্নান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন- গ্রাম থিয়েটার কেন্দ্রীয় পর্ষদ সদস্য গাজীবর রহমান, খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী একরামুল হক লিকু, রাজশাহীর পদ্মা বড়াল থিয়েটারের সাজেদুল করিম, সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র থিয়েটারের হিমু সহ বিশিষ্টনাট্যজনরা। উদ্বোধন ঘোষণার পর পরিবেশিত হয় পালা নাটক, ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গীত ও নৃত্য। এরআগে রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডে অগ্নিদুর্ঘটনায় নিহত এবং সারথি থিয়েটারের প্রয়াত বন্ধুদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

তিনদিনের এই নাট্যোৎসবে তিনটি পালানাটক পরিবেশিত হয়। উদ্বোধনের দিনে পরিবেশিত হয় সেলিম আল দীনের ‘যৈবতী কণ্যার মন’ অবলম্বনে সারথী থিয়েটারের ‘কালিন্দীর গীত’ নাটকটি। এটি রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন সায়িক সিদ্দিকী। দ্বিতীয় দিন মঞ্চস্থ হয় আসমা আক্তার লিজার রচনা ও নির্দেশনায় নাট্যনন্দন ঢাকার নাটক ‘বিষ পবনের গীত’ এবং তৃতীয় দিন রূপবান গাঁথা অবলম্বনে সায়িক সিদ্দিকীর রচনা ও নির্দেশনায় পাঁচবিবি থিয়েটার জয়পুরহাটের নাটক ‘রূপবান কইন্যার পালা’। এই নাট্যোৎসব উপলক্ষে গুণীশিল্পীদের পদক প্রদান, কুশান, গম্ভীরা, আলকাপ ব্রতচারী, ঐতিহ্যবাহী গীত-নৃত্যের আয়োজন করা হয়।

 

হাকিম আলী গায়েন পালানাট্য উৎসব মঞ্চে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের আলোচনায় অংশ নেন- গ্রাম থিয়েটারের প্র্রচার সম্পাদক আ. হান্নান, চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর শাহ্ মাইনুল ইসলাম শিল্পু, ঘাগোয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমিনুর জামান রিংকু, সঙ্গীত শিল্পী চুনি ইসলাম, সংবাদকর্মী আফরোজা লুনা, গ্রাম থিয়েটার কেন্দ্রীয় পর্ষদ সদস্য হাবিব রহমান হাবিব, গ্রাম থিয়েটারের পু-্র অঞ্চল সমন্বয়ক শাহাজাদ আলী বাদশা, ইলামিত্র-অক্ষয় মৈত্রেয় অঞ্চল সমন্বয়ক সাগর কুমার।

আসরে গুণীশিল্পী সম্মাননা গ্রহণ করেন- শাহ্ মশিউর রহমান, প্রমতোষ সাহা, স্বপন কুমার সাহা, আসমা আক্তার লিজা, কৃপা সিন্ধু রায় সরকার, অরূপ বাউল, হাবিবুর রহমান হাবিব। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন- গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক তৌফিক হাসান ময়না ও তবলাশিল্পী মাহমুদ সাগর মহব্বত। বীরপ্রতীক তারামন বিবি স্কুলের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে ‘ডালিম কুমার’ ও ‘কঙ্কাবতী’র গল্প। এছাড়া রাজশাহীর পদ্মা বড়াল থিয়েটার গম্ভীরা এবং কুশান পরিবেশন করেন কৃপা সিন্ধু রায় সরকার।

 

সারথী থিয়েটারের ত্রিশ বছর পূর্তিতে আয়োজিত তিনদিন ব্যাপী ‘হাকিম আলী গায়েন পালানাট্য উৎসব’ গত রোববার (৩ মার্চ) রাতে শেষ হয়।

 

আয়োজক সংগঠন সারথীর প্রধান সম্পাদক জুলফিকার চঞ্চল জানালেন- বাংলাদেশের আবহমান নাট্যধারা ‘পালা’। গ্রামগঞ্জে এখনো প্রতিনিয়ত শত-শত পালা, জারি, যাত্রা মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে। সাধারণত গ্রামে পরিবেশনযোগ্য কাহিনিকেই ‘পালা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কাহিনির প্রাধান্য বা নির্ভরতা বিদ্যমান থাকে বলেই এ-শ্রেণির নাট্যকে ‘পালা’ বলে। বন্দনা, বর্ণনা, নাচ, গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে পালা উপস্থাপিত হয়। ‘পালা’ আঙ্গিকটি বাঙালি জীবনের মধ্যযুগে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এ-নাট্যাঙ্গিক চারপাশে দর্শকবেষ্টিত খোলা মঞ্চে অভিনীত হতো। কখনো-কখনো কৃত্রিম মঞ্চেও প্রদর্শিত হয়। পালা সাধারণত লোকায়ত হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় বা বিশ্বাসগত বিষয়বস্তু এবং বাঙালি জীবনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যনির্ভর নানা বিষয় ও চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।

Tag :

গাইবান্ধায় পালানাট্যের অভূতপূর্ব উৎসব

Update Time : ০৩:৩৪:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মার্চ ২০২৪

উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় সারথী থিয়েটার নামে এক তারুণ্যদীপ্ত নাট্যদল তাদের দলের ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে পালানাট্য উৎসবের আয়োজন করে। গাইবান্ধাকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার এ দলটির তিনদিনের পালানাট্য উৎসবে উপচেপড়া দর্শক উপস্থিতি জানান দেয়- বাংলাদেশের আবহমান নাট্যধারা ‘পালা’। আজো গ্রামীণ বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় পরিবেশনা ‘পালা’।

 

দর্শকমুখর পরিবেশে গত ১ মার্চ (শুক্রবার) গাইবান্ধা সদরের দারিয়াপুর হাটখোলায় সন্ধ্যা ৭টায় তিনদিন ব্যাপী ‘হাকিম আলী গায়েন পালানাট্য উৎসব’-এর উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। উদ্বোধন করেন লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও লেখক অধ্যাপক মাজহারউল মান্নান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন- গ্রাম থিয়েটার কেন্দ্রীয় পর্ষদ সদস্য গাজীবর রহমান, খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী একরামুল হক লিকু, রাজশাহীর পদ্মা বড়াল থিয়েটারের সাজেদুল করিম, সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র থিয়েটারের হিমু সহ বিশিষ্টনাট্যজনরা। উদ্বোধন ঘোষণার পর পরিবেশিত হয় পালা নাটক, ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গীত ও নৃত্য। এরআগে রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডে অগ্নিদুর্ঘটনায় নিহত এবং সারথি থিয়েটারের প্রয়াত বন্ধুদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

তিনদিনের এই নাট্যোৎসবে তিনটি পালানাটক পরিবেশিত হয়। উদ্বোধনের দিনে পরিবেশিত হয় সেলিম আল দীনের ‘যৈবতী কণ্যার মন’ অবলম্বনে সারথী থিয়েটারের ‘কালিন্দীর গীত’ নাটকটি। এটি রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন সায়িক সিদ্দিকী। দ্বিতীয় দিন মঞ্চস্থ হয় আসমা আক্তার লিজার রচনা ও নির্দেশনায় নাট্যনন্দন ঢাকার নাটক ‘বিষ পবনের গীত’ এবং তৃতীয় দিন রূপবান গাঁথা অবলম্বনে সায়িক সিদ্দিকীর রচনা ও নির্দেশনায় পাঁচবিবি থিয়েটার জয়পুরহাটের নাটক ‘রূপবান কইন্যার পালা’। এই নাট্যোৎসব উপলক্ষে গুণীশিল্পীদের পদক প্রদান, কুশান, গম্ভীরা, আলকাপ ব্রতচারী, ঐতিহ্যবাহী গীত-নৃত্যের আয়োজন করা হয়।

 

হাকিম আলী গায়েন পালানাট্য উৎসব মঞ্চে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের আলোচনায় অংশ নেন- গ্রাম থিয়েটারের প্র্রচার সম্পাদক আ. হান্নান, চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর শাহ্ মাইনুল ইসলাম শিল্পু, ঘাগোয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমিনুর জামান রিংকু, সঙ্গীত শিল্পী চুনি ইসলাম, সংবাদকর্মী আফরোজা লুনা, গ্রাম থিয়েটার কেন্দ্রীয় পর্ষদ সদস্য হাবিব রহমান হাবিব, গ্রাম থিয়েটারের পু-্র অঞ্চল সমন্বয়ক শাহাজাদ আলী বাদশা, ইলামিত্র-অক্ষয় মৈত্রেয় অঞ্চল সমন্বয়ক সাগর কুমার।

আসরে গুণীশিল্পী সম্মাননা গ্রহণ করেন- শাহ্ মশিউর রহমান, প্রমতোষ সাহা, স্বপন কুমার সাহা, আসমা আক্তার লিজা, কৃপা সিন্ধু রায় সরকার, অরূপ বাউল, হাবিবুর রহমান হাবিব। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন- গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক তৌফিক হাসান ময়না ও তবলাশিল্পী মাহমুদ সাগর মহব্বত। বীরপ্রতীক তারামন বিবি স্কুলের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে ‘ডালিম কুমার’ ও ‘কঙ্কাবতী’র গল্প। এছাড়া রাজশাহীর পদ্মা বড়াল থিয়েটার গম্ভীরা এবং কুশান পরিবেশন করেন কৃপা সিন্ধু রায় সরকার।

 

সারথী থিয়েটারের ত্রিশ বছর পূর্তিতে আয়োজিত তিনদিন ব্যাপী ‘হাকিম আলী গায়েন পালানাট্য উৎসব’ গত রোববার (৩ মার্চ) রাতে শেষ হয়।

 

আয়োজক সংগঠন সারথীর প্রধান সম্পাদক জুলফিকার চঞ্চল জানালেন- বাংলাদেশের আবহমান নাট্যধারা ‘পালা’। গ্রামগঞ্জে এখনো প্রতিনিয়ত শত-শত পালা, জারি, যাত্রা মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে। সাধারণত গ্রামে পরিবেশনযোগ্য কাহিনিকেই ‘পালা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কাহিনির প্রাধান্য বা নির্ভরতা বিদ্যমান থাকে বলেই এ-শ্রেণির নাট্যকে ‘পালা’ বলে। বন্দনা, বর্ণনা, নাচ, গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে পালা উপস্থাপিত হয়। ‘পালা’ আঙ্গিকটি বাঙালি জীবনের মধ্যযুগে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এ-নাট্যাঙ্গিক চারপাশে দর্শকবেষ্টিত খোলা মঞ্চে অভিনীত হতো। কখনো-কখনো কৃত্রিম মঞ্চেও প্রদর্শিত হয়। পালা সাধারণত লোকায়ত হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় বা বিশ্বাসগত বিষয়বস্তু এবং বাঙালি জীবনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যনির্ভর নানা বিষয় ও চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।